হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২০, ০২:১৬ এএম

করোনাভাইরাস আতঙ্কে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সসহ  কর্মরতরা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব ও রোগী নিজের তথ্য গোপন রাখায় সংক্রমণ ঝুঁকিতে আছেন তারা। এরপরেও কেবলমাত্র পেশার খাতিরে যতটুকু সতর্ক থাকা সম্ভব ততটুকু অবলম্বন করে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন তারা।

এদিকে গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, মিটফোর্ড  হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় জ্বর, সর্দি-কাশিসহ রোগী ও সাধারণ রোগী একই স্থান থেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন। মেডিসিন বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছার আগে সব ধরনের রোগী একসঙ্গেই থাকছেন। আবার সন্দেহজনক রোগীদের সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) যাওয়ার জন্য বলা হলেও তাদের সেখানে যাওয়ার জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই ওইসব রোগী পাবলিক পরিবহনে করে আইইডিসিআরে যাচ্ছেন। সবাই আইইডিসিআরে যাচ্ছেন কি না তা যাচাই করারও কোনো সুযোগ নেই। তাই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া করোনা আতঙ্কে যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তারাও হাসপাতাল ছাড়ছেন। কমে গেছে নতুন রোগী ভর্তির হার।

এ বিষয়ে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জরুরি ও বহির্বিভাগে অনেক রোগী একত্রে গাদাগাদি করে অবস্থান করেন। এদের একজনের শরীরে করোনা থাকলে অনেকেরই মধ্যেই ছড়াবে। এমনকি চিকিৎসকের দেহেও ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তখন চিকিৎসকরাই করোনা ছড়ানোর উৎস হয়ে যাবেন। ইতালিতে এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও আড়াই হাজারেরও বেশি চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত। তাই যাদের সর্দি-কাশিসহ জ্বর আছে তারা যেন সরাসরি হাসপাতালে না গিয়ে আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যদি আইইডিসিআর তাদের হাসপাতালে যেতে বলে তাহলে অবশ্যই যেন করোনার জন্য যে চারটি নির্ধারিত হাসপাতাল আছে সেখানে যান। পাবলিক পরিবহনে না গিয়ে সিএনজি বা রিকশাযোগে যাবেন। অবশ্যই তখন নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরে হাত, মুখ, নাক ভালোভাবে ঢেকে যাবেন। রাস্তায় কোনোভাবেই থুথু ফেলতে পারবেন না।’

গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, টিকিট কাউন্টারে সব ধরনের রোগী একই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটছেন। যারা জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে এসেছেন তারা মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার দেখানোর পূর্ব পর্যন্ত একসঙ্গেই থাকছেন। ডাক্তার শরীরের তাপমাত্রা ও উপসর্গ জেনে যাদের সন্দেহজনক মনে করছেন তাদের চিকিৎসা না দিয়ে আইইডিসিআরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এরপর ওইসব রোগী যার যার মতো করে হাসপাতাল ত্যাগ করছেন। এর আগে তাদের সঙ্গে যারা মিশেছেন তাদের প্রয়োজনীয় পথ্য লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকরা রোগী দেখার সময় নিরাপত্তা পোশাক পরিধান করছেন। নিয়মিত সেনিটাইজার দিয়ে স্টেথোস্কোপ পরিষ্কার করছেন।

ওই হাসপাতালে বহির্বিভাগের এক রোগী বলেন, এখানে এসে দেখছি বিপদ আরও বেড়ে গেল। জ্বরের রোগী আর অন্যসব রোগীর একসঙ্গে টিকিটের লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। বলা তো যায় না, এদের মধ্যে কারও শরীরে করোনা ভাইরাস থাকলেও থাকতে পারে। তাহলে তো সবার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

মেডিসিন বিভাগের এক চিকিৎক বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করলেও শঙ্কামুক্ত না। কয়েকজন ইতিমধ্যে আইসোলেশনে। এরপরেও রোগী দেখতে হচ্ছে। স্থান ও চিকিৎসক কম থাকায় সব রোগীকে একসঙ্গে টিকিট কাটা থেকে শুরু করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে ঝুঁকি তো থেকেই যায়।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য সময়ে হাসপাতালটিতে রোগী ও তার স্বজনদের পদচারণায় মুখর থাকলেও বর্তমান চিত্র ভিন্ন। খুব প্রয়োজন না হলে কেউ হাসপাতালে আসছেন না। জরুরি বিভাগের করিডর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ড সবখানেই নীরবতা। সবাই করোনা সংক্রমণের ভয়ে আতঙ্কিত। সাধারণত ওই হাসপাতালের ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকলেও বর্তমানে অনেক বিছানা ফাঁকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছি। হাসপাতালে যেসব রোগী আসছেন তাদের অনেকেই প্রবাসী ছিলেন অথবা তাদের পরিবারে কেউ প্রবাসী। এছাড়া করোনাভাইরাসের লক্ষণ ১৪ দিন পরেও প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু এই সময়ের আগেই এই রোগ অন্যের শরীরে ছড়ায়। এখন কার শরীরে করোনা আছে আর কার নেই সেটা আমরাও জানি না। কিন্তু চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া সার্বক্ষণিক সেবা দেওয়ার কারণে নার্স ও আবাসিক চিকিৎসকরা আরও বেশি ঝুঁকিতে। তাদের সঙ্গে আমরাও মিশছি। জানি না অবস্থা কী দাঁড়াবে। কিন্তু আমরা খুব আতঙ্কিত। এজন্য পরিবারের সঙ্গে সাবধানতার সঙ্গে মিশছি।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে একজন ভর্তি রোগী বলেন, এখানে একজন রোগী ভর্তি ছিলেন। তিনি ও তার পরিবারের লোকজন আমাদের সঙ্গে মিশছেন। এখন শুনতে পাচ্ছি উনি করোনায় আক্রান্ত, এজন্য ওনাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই ভয়ে হাসপাতালের অনেকেই সুস্থ হওয়ার আগে বাড়িতে চলে গেছেন। দুদিনে হাসপাতাল ফাঁকা হয়ে গেছে। আমিও আতঙ্কে। নার্সরাও ভয়ে ভয়ে সেবা দিচ্ছেন।

শাহ আলম নামে ওই হাসপাতালে এক ভর্তি রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমার শাশুড়ির অপারেশন করিয়েছিলাম এখানে। এরপর থেকে উনি ভর্তি ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যে অবস্থা তাতে হাসপাতালে থাকা নিরাপদ মনে হচ্ছে না। এজন্য পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই শাশুড়িকে নিয়ে চলে যাচ্ছি।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে দেখা যায়, জ্বরের রোগীদের জন্য নেই কোনো আলাদা ব্যবস্থা। এতে হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে সাধারণ রোগী সবাই করোনা আতঙ্কে। সাধারণ ও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হলেও জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগীদের মধ্যে যাদের সন্দেহ হচ্ছে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। জরুরি বিভাগে যেসব রোগী এসেছেন তারাও আতঙ্কিত। ওয়ার্ডগুলোতে অন্যান্য সময়ের চেয়ে ভর্তি রোগী অনেক কম। করোনা শনাক্তের কিট না থাকায় সন্দেহজনক রোগীদের আইইডিসিআরে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, এখানে নানা ধরনের রোগী আসছে। এদের মধ্যে কে করোনা সংক্রমিত সেটা বোঝার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমারা তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিশছি। এতে আমরা আতঙ্কিত। এরপরেও সতর্কতার সঙ্গে সেবা চালিয়ে যাচ্ছি।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অথচ আমরা যদি সংক্রামিত হই তাহলে দেশের চিকিৎসাসেবাই ভেঙে পড়বে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েকজন চিকিৎসক আইসোলেশনে আছেন। তাই রোগী ও তার স্বজনদের প্রতি অনুরোধ, দেশ ও আপনাদের স্বার্থে তথ্য গোপন করবেন না। সঠিক তথ্য দিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিন। আমরা অসুস্থ হলে আপনি ও আপনার স্বজনই বিনা চিকিৎসায় ভুগবেন।’ চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এরপরেও সবাইকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি দিচ্ছি। প্রতিদিন সকালে সবাইকে নিয়ে আলাদা আলাদা মিটিং করে করণীয় ঠিক করছি। যাদের ফ্লু সমস্যা আছে তাদের ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সেবা দিয়ে আইইডিসিআরে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত