করোনা ব্যবস্থাপনায় মন দিন

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ১২:২১ এএম

ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর উপকূলীয় অঞ্চলে হানা দেওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা ছিল সে কথা সর্বজনবিদিত। এমনকি একটা সাইক্লোন শেল্টার পর্যন্ত ছিল না। আমরা বরাবরই দেখেছি বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পূর্বপ্রস্তুতি বলতে কিছু থাকে না। সব ধরনের প্রস্তুতি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয় দুর্যোগ সৃষ্টি হওয়ার পর। সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক বা মহামারী। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মহামারীর প্রকৃতি ও ধরন ঠিক এক রকম না। সে ক্ষেত্রে এর প্রস্তুতিও ভিন্নরকম বলাই বাহুল্য। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কথা সবার জানা। সে প্রসঙ্গে বলতে গেলে চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল দুই মাস আগে। তারপরও ভূ-প্রকৃতিগত অবস্থান, খাদ্যাভ্যাস ও নানা অজুহাত দেখিয়ে এদেশে এর সংক্রমণ না ছড়ানোর সম্ভাবনার কথা অনেকেই ব্যক্ত করেছিলেন। যাদের মধ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবিধারীরাও বাদ যাননি। কিন্তু যখন ভাইরাসটা ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকায় দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তখনো এদেশের সরকারকে এই সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। শুরুতেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু একটা উৎসব আয়োজনে বেশি তৎপর হতে গিয়ে এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা তারা এড়িয়ে গেছে। আর সেই ফাঁকে গত ৫৫ দিনে বিমানবন্দর থেকে এদেশে প্রায় বিনা বাধায় ঢুকে পড়েছে ছয় লাখ চব্বিশ হাজার মানুষ। এবং এরা সবাই দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক সময়ে বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বিভিন্ন স্থানে লকডাউন করে দেওয়া অনেকটা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো অবস্থা হয়েছে।  বাংলাদেশের মতো একটা দেশে যেখানে বেশিরভাগ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই সেখানে করোনাভাইরাসের মতো একটা প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়লে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় আজ যখন এদেশে ২০জন এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত তখন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা সরকারকে লকডাউন ও জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছে।

যদি লকডাউন হয়ে যায় তাহলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে যাবে এদেশের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ। এদেশের বেশিরভাগ মানুষের দিন আনি দিন খাই অবস্থা। তাদের খেয়ে বেঁচে থাকার বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম, ভারতের কেরালা প্রদেশে সে দেশের প্রাদেশিক সরকার সেখানে বিনামূল্যে এক মাসের রেশন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। আমাদের সরকারেরও বিষয়টা ভেবে দেখতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে তাই এই সব রেশন বিতরণের সুব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রেশন ম্যানেজমেন্টে কোনো রকম অবহেলা, পক্ষপাতিত্ব, দলপ্রীতি স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে সরকারকে।

দেশের বেশিরভাগ প্রান্তিক মানুষ এনজিওগুলোর কাছ থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজকর্ম করে থাকে। এই সময়ে ঋণের কিস্তি দেওয়া থেকে তাদের রেহাই দিতে হবে। 

নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে সরকার ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। গত কয়েক দিনে চলের দাম মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, আলু ৪০ টাকা থেকে ৭০ টাকা হয়েছে। এ অনুসারে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। ওষুধের দোকানে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। বাজার ব্যবস্থার সর্বত্র সিভিল প্রশাসন নামানোর পরও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি আমরা দেখেছি। প্রয়োজনে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামাতে হবে। 

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। যে দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার-লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায় সে দেশে জিডিপি হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ২.৬৪%। যেখানে আমেরিকায় ১৬.৮৪%, জার্মানিতে ১১.১৫%, জাপানে ১০.৮%, আফগানিস্তানে ১০.২%, ব্রাজিলে ৮.৯১%, ইথিওপিয়ায়ং ৪.৬৪%। ইথিওপিয়ার মতো একটা দেশের চেয়েও আমাদের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় যেখানে কম সেখানে করোনার মতো একটা মহামারী মোকাবিলায় আমাদের কী পরিস্থিতি হতে পারে ভেবে দেশের চিকিৎসকরা এবং চিকিৎসাসেবায় নিয়েজিত কর্মীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। রোগ সেভাবে ছড়ালে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকবেন চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা। সেদিক থেকে তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এমনিতেই ডাক্তার নার্সদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে এবং প্রশিক্ষণ দিতে দেরি হয়ে গেছে। এমনকি তাদের প্রয়োজনীয় কিট এবং প্রটেকটিভ গিয়ারের ব্যবস্থা করা হয়নি। তদুপরি ইতিমধ্যে তাদের যে ধরনের পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট দেওয়া হয়েছে তা মোটেই নিরাপদ নয় বরং হাস্যকর ও প্রহসনমূলক। সম্প্রতি ১০০ কোটি টাকা করোনা মোকাবিলায় বরাদ্দের একটা ঘোষণা এসেছে। এর প্রপার ইউটিলাইজেশন দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে প্রতিটি জেলা সদরে এবং পরে থানা পর্যায়ে একটি করে মোটামুটি বড় আকারের অবকাঠামো চিহ্নিত করা দরকার যেখানে করোনা রোগীকে আইসোলেশনে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সর্বোপরি এখনো স্থানীয় পর্যায়ে, পাড়ায়, মহল্লায় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যেতে হবে। অনেকেই মনে করেন ‘এই রোগ আমার হবে না’। এবং এই কনফিডেন্স থেকে অসতর্কতা ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। করোনা প্রতিরোধে করণীয় কাজগুলো প্রান্তিক, অশিক্ষিক মানুষের মধ্যে সহজবোধ্য করতে হবে। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন, ইত্যাদি নতুন নতুন শব্দ তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি আবার এক ধরনের উদাসীনতাও সৃষ্টি করছে। বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। স্থানীয়ভাবে বেশিরভাগ বিদেশ ফেরত ব্যক্তি কোয়ারেন্টাইনের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অথচ যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। 

ভীতি নয় সাহস, সচেতনতা, সতর্কতা ও পরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের এগোতে হবে। নানারকম দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, সঙ্গে যোগ করতে হবে অন্যান্য দেশের করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা। তাহলে হয়তো আমরা এই মহামারী কাটিয়ে উঠতে পারব। সবাই মিলে সাহায্য সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ মোকাবিলা আমাদের করতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত