ভারতজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত কারফিউ পালন

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ০২:০৭ এএম

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডাকে গতকাল রবিবার ১৪ ঘণ্টার জন্য দেশজুড়ে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত কারফিউ পালন করেছে। কারফিউর সময় জরুরি পরিষেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন যে কাউকে বাড়ির বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়। এসময় ভারতের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা বাড়ির ব্যালকনি থেকে থালাবাসন পিটিয়ে ও শঙ্খ বাজিয়ে জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের ধন্যবাদ দেন।

ভারতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ জনে। মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। আপাতত করোনার থার্ড স্টেজের দিকে এগোচ্ছে মহারাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জনতা কারফিউর ডাক দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই জনতা কারফিউ পালনের ডাক নিয়ে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা কটাক্ষ করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর সমর্থনে ব্যাপক লেখালেখি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরাও এই কারফিউ পালনের পক্ষ নিয়ে মতামত জানিয়েছেন। তবে তারা বলছেন, মাত্র ১৪ ঘণ্টার এই কারফিউ সংক্রমণের হারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। অনেকে তো বলেছেন, এ রকম কারফিউ আগামী সপ্তাহে আরও ২ থেকে ৩ বার হওয়া উচিত। তাহলে সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।

ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সমর্থন জানিয়ে ট্রেন বন্ধ রাখা হচ্ছে। গতকাল রবিবার ভোর থেকে বন্ধ থাকবে মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন। কোনো বিমানও চালানো হবে না বলে জানিয়েছে একটি বিমান সংস্থা।

দিল্লিতে মেট্রো ট্রেন বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কলকাতায় মেট্রো চলবে অর্ধেকের কম। অবশ্য মুম্বাই, পুনে ও নাগপুর ইতিমধ্যেই লকডাইন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কলকাতায় ২৭ মার্চ বিকাল ৫টা পর্যন্ত লকডাউন জারি করা হয়েছে। রবিবার রাজ্য সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে বন্ধ থাকবে জরুরি পরিষেবা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের জারি করা ঘোষণায় বলা হয়েছে, ১৮৯৭ সালের মহামারী রোগ (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী সোমবার ২৩ মার্চ বিকেল ৫টা থেকে ২৭ মার্চ রাত ১২টা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম ও শহর এলাকায় কিছু পরিষেবায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। জনস্বার্থেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করছে রাজ্য সরকার।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে লকডাউন ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৩১ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত দিল্লিতে লকডাউন বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল বলেন, আমরা আগামীকাল (সোমবার) সকাল ৬টা থেকে ৩১ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত দিল্লিতে লকডাউন আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এবার বাড়ি থেকে কাজ করবে ভারতীয় সেনাবাহিনীও। গত শুক্রবার আর্মি হেডকোয়ার্টারের তরফে জানানো হয়েছে, সেনাবাহিনীর ৩৫% অফিসার এবং ৫০% জেসিও (জুনিয়র কমিশনড অফিসার) এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে থেকে কাজ করবেন।

ভারতের অন্যতম প্রধান ভাইরোলজিস্ট টি জেকব বলেছেন, এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউতে মানুষ যদি রাস্তায় না বেরিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে তাহলে সেদিনের জন্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে তো বটেই। তবে জেকব মনে করেন, এই জনতা কারফিউর সবচেয়ে বড় উপকার হবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অভ্যাস তৈরি হবে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের অধিকর্তা কমলেশ সরকার বলেছেন, আদতে এই কারফিউয়ে লাভই হবে ভারতবাসীর। তিনি মনে করেন গোষ্ঠী সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেছেন, কয়েক ঘণ্টার কারফিউতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংক্রমণ বিশেষ ঠেকানো সম্ভব হবে না ঠিকই, তবে সামাজিক স্তরে মানুষকে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত করবে। যেটা এখন একান্তই প্রয়োজন।

করোনাভাইরাসের কারণে ভারতজুড়ে বন্ধ রেল ও মেট্রো পরিষেবা। একই পথে হাঁটছে আন্তঃরাজ্য বাস পরিষেবাও। সরকারি গণপরিবহন, শপিং মল, দোকানপাট থেকে শুরু করে জমায়েত হতে পারে, এমন জায়গাগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাঞ্জাব, রাজস্থান। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, যে ৭৫ জেলায় করোনাভাইরাস দেখা দিয়েছে, সেখানে শুধু জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে। সূত্র : এএফপি, এনডিটিভি, বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত