কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২০, ০১:২২ এএম

বাংলাদেশে সীমিত আকারে কমিউনিটিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। তবে রোগটি ব্যাপকহারে কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় সংস্থাটি।

এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার করোনা নিয়ে অনলাইনে এক ব্রিফিংয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আমরা দুইটি ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করছিলাম। এখন পর্যন্ত সেখানে সংক্রমিত হওয়ার উৎস সম্পর্কে জানা যায়নি। সে কারণে সীমিতভাবে কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে বলে আমরা মনে করছি। কিন্তু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলার আগে আগে আমাকে বিস্তারিত তথ্যের বিশ্লেষণে বলতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, লিমিটেড স্কেলে যে এলাকাটির কথা আমরা বলছি, সেখানে লোকাল ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে ভেবে আমরা ওই এলাকাটিকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে সেটা প্রতিরোধ করার কার্যক্রম নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটা বাংলাদেশব্যাপী ট্রান্সমিশন হয়েছে, এরকম কোনো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলার ক্ষেত্রে আমাকে

বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ সেটি আমাকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কাছে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ পেশ করতে হবে। সীমিত আকারে হলেও কমিউনিটি সংক্রমণের কারণে বাংলাদেশ করোনা প্রাদুর্ভাবের তৃতীয় স্তরে পৌঁছাল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর জন্য তারা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে প্রাদুর্ভাব বলতে হলে একেবারের নিশ্চিত হতে হবে। আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সমীর কে সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো করোনা প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ তৃতীয় স্তরে, অর্থাৎ কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ার স্তরে পৌঁছেছে কি না, তা বলা যাবে না। এর জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। একেবারেই যখন ‘সোর্স অব  ইনফেকশন’ জানা যাবে না, কিন্তু আক্রান্ত হবে, তখনই কেবল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলা যাবে।

তবে এই সীমিত আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতেও রোগটি যেন আর ব্যাপকহারে কমিউনিটিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন অণুজীববিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. সমীর কে সাহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন একমাত্র কাজ পরীক্ষা। যেখানে যাকেই সন্দেহ হবে, বা উপসর্গ দেখা দেবে, সেখানে তারই পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি এই মুহূর্তে ঘরে বসে থাকাটাই সবচেয়ে ভালো।

দুটি কারণে আইইডিসিআর সীমিত আকারে কমিউনিটিতে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন। এর মধ্যে একটি হলো রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগে যে রোগী করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি এবং গতকাল ৬৫ বছরের যে ব্যক্তি মারা গেছেন।

প্রথমটির ক্ষেত্রে আইইডিসিআর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, যে রোগীর কথা বলছেন (টোলারবাগে মৃত রোগী) তার ক্ষেত্রে আমরা তাদের পাশে বিদেশ থেকে এসেছেন এমন দুই ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছি। আমরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা দেখতে চাই তাদের সংক্রমণ ছিল কি না, ওই ব্যক্তির করোনা সংক্রমণ এদের কাছ থেকে এসেছে কি না। তাদের একজনের ক্ষেত্রে আমরা সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছি। আমরা এক্সটেনসিভভাবে তাদের তথ্য সংগ্রহ করছি। অন্যজনেরও করছি। এখনো আমাদের সব তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়নি। আমরা তথ্য যখন পেয়ে যাব তখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে কি না জানা যাবে।

দ্বিতীয় রোগীর ক্ষেত্রে তিনি জানান, গতকাল বুধবার ৬৫ বছর বয়সী যে ব্যক্তি মারা গেছেন, তিনি ১৮ মার্চ কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছিলেন। তখন তিনি তার এলাকার একটি হাসপাতালে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ২১ তারিখ থেকে তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার বয়স ছিল ৬৫। তার ডায়াবেটিস ও হাইপার টেনশন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তার থেকেই কমিউনিটিতে সীমিত আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে পরিচালক বলেন, সীমিত মাত্রায় যে এলাকাটি নিয়ে আমরা কথা বলেছি, সেই এলাকায় লোকাল ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে। কারণ এখন পর্যন্ত সেটার ‘সোর্স অব ইনফেকশন’ (সংক্রমণের উৎস) জানা যায়নি। এটা ভেবেই কিন্তু সেখানে সাময়িকভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ নিশ্চিত করে তা প্রতিরোধ করার ও নিয়ন্ত্রণ করার কার্যক্রম নিয়েছি।

তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশব্যাপী কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানান আইইডিসিআর পরিচালক। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে একজনেরও কভিড-১৯ পাওয়া যায়নি। গতকালও যে নমুনা পরীক্ষা করেছি তাতে কভিড-১৯ পজেটিভ আসার হার কিন্তু খুব কম।

পরিচালক জানান, তারা এখন হাসপাতালে আসা নিউমোনিয়ার রোগীর নমুনাও পরীক্ষা করছেন। এ ধরনের পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত দুজনের কভিড-১৯ পজেটিভ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে তাদের বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস পাওয়া গেছে।

কম্যুনিটি সংক্রমণ প্রশ্নে এর আগে আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ‘যখন কোনো সংক্রামক রোগের বিস্তার এমনভাবে ঘটে যে, তার উৎস সম্পর্কে তথ্য জানা যায় না, যেমন কভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে যখন বিদেশফেরতদের সংস্পর্শ ছাড়াই একজন ব্যক্তি থেকে আরেকজন ব্যক্তির শরীরে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে, হয়তো কাজ বা কেনাকাটা করতে গিয়ে, অথবা এমন মানুষের মধ্যে ছড়ায় যারা মনে করেন যে, তারা আক্রান্ত হননি, এভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়লে তখন তাকে কম্যুনিটি সংক্রমণ বলা হয়। তবে কভিড-১৯ সংক্রমণের মতো ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির পূর্ব ইতিহাস পাওয়া যায়, যেমন তিনি বিদেশে ভ্রমণ করেছেন কি না অথবা বিদেশি বা বিদেশফেরত কারও সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না, তখন পর্যন্ত সেটিকে কম্যুনিটি সংক্রমণ বলা যাবে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশেই কভিড-১৯ ভাইরাসের কম্যুনিটি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, সার্স ভাইরাসের মহামারী কম্যুনিটি ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে হয়েছিল।

সীমিত আকারেও যদি করোনাভাইরাস কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সে পরিস্থিতিতে করোনা প্রাদুর্ভাবের ‘তৃতীয় স্তর’ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) প্রধান চিকিৎসক এবং পুষ্টি ও চিকিৎসা বিভাগের প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কেস (রোগী) শনাক্ত করা যায়, কিন্তু তিনি বিদেশফেরতদের সংস্পর্শে গিয়েছিলেন কি না, কার সংস্পর্শে গিয়ে সংক্রমিত হয়েছেন, এমন সোর্স জানা যায় না, সেটাকে আমরা তৃতীয় স্তর বলি।

এমন পরিস্থিতিতে করণীয় কী- জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকার ছুটি ঘোষণা করলেও আমরা বিপুল সংখ্যক মানুষকে রাখতে পারিনি। তারা স্থান ত্যাগ করেছেন। এতে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন সবার উচিত হবে যে যেখানে আছেন, সেখানেই থাকা, ঘরের ভেতর থাকা। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে না। রাস্তাঘাটে, এমনকি বাসার ভেতরও দূরত্ব রেখে চলাফেরা করতে হবে।

এ সময় উচিত হবে পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া- উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়া কিন্তু টেস্ট করেই সফলতা এনেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুদিন আগেও শনাক্ত ও টেস্টের ওপর জোর দিয়েছে। রাজধানীসহ জেলা উপজেলা পর্যায়ে যাকেই সন্দেহ হবে তার পরীক্ষা করতে হবে। যত বেশি পরীক্ষা করা যাবে, ততই রোগের সংক্রমণ ঠেকানো সহজ হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত