পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জোর দিন

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২০, ১১:২৭ পিএম

করোনাভাইরাস মহামারীতে সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর।  অন্য মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার জন্য সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইন বা ঘরবন্দি থাকতে বলা হয়েছে। তেমনি বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলেও অন্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা, নাকেমুখে মাস্ক পরে থাকাসহ বারবার হাত ধোয়া ও জীবাণুনাশক ব্যবহার করা ইত্যাদির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে করোনা উপদ্রুত বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন, বাসস্টেশন, বাজার ও দোকানপাটসহ যেসব স্থানে মানুষকে যেতেই হচ্ছে সেসব স্থানে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে এবং যতটা সম্ভব ময়লা-আবর্জনামুক্ত রেখে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের দেশে বিশেষ উদ্বেগের কারণ রয়েছে খোদ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষা নিয়েই। বিশেষত সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা ও রাস্তাঘাটের ময়লা-আবর্জনা সরানোর কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিজেরা সুরক্ষিত না থাকলে তারা যেমন করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন, তেমনি তাদের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার ‘করোনাঝুঁকিতে ঢাকার ৮ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহে কাজ করে প্রায় ৮ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এ কাজ করতে গিয়ে সারা বছরই তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। এখন যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি। কিন্তু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষায় এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সিটি করপোরেশন। ফলে বিশাল আয়তনের এই শহরের বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা এ বিশাল কর্মীদের সংস্পর্শে করোনাভাইরাস আরও বেশি ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষা দিতে করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।  ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতিতেও জনসমাগম ঘটে এমন স্থানে জীবাণুনাশক ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে কোথাও যেন ময়লা-আবর্জনা জমে না থাকে সেজন্য নিয়মিত তা পরিষ্কার করা হচ্ছে। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এখনো বিশেষ কোনো সুরক্ষা পোশাক দেওয়া হয়নি কিংবা জীবাণুনাশক ব্যবহারসহ তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধ করতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। 

সিটি করপোরেশন এলাকায় নিয়মিত রাস্তাঘাট পরিষ্কারের পাশাপাশি বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করা এবং বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট ট্রান্সফার স্টেশন থেকে ট্রাকে বর্জ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করে থাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।  ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৮ হাজার নিয়মিত কর্মীর বাইরেও আরও বেশ কিছু সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে থাকে। এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে এই মহামারীর সময়ে রাজধানীতে করোনাভাইরাসের নীরব বাহক হয়ে উঠতে পারে তারা। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে করোনা সংক্রমণ মুক্ত রাখতে যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও।  অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকা রাজধানীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাটা খুবই জরুরি। নইলে আসন্ন বৃষ্টি-বর্ষার সময়ে অপরিচ্ছন্ন মহানগরে ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদেরও করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করে দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা মহানগরে করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

করোনাভাইরাস মহামারীতে ঢাকা মহানগরের বাসিন্দারাসহ দেশের বেশিরভাগ মানুষই আগামী বেশ কিছুদিন হোম কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউন পরিস্থিতিতে একপ্রকার ঘরবন্দি থাকবেন। কিন্তু এই সময়েও হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানসহ কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের মুদি দোকান খোলা থাকবে। অল্প হলেও সেসব স্থানে মানুষ যাবে এবং সেখানেও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি ঘরবন্দি মানুষের জন্য পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের মতো জরুরি পরিষেবার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা। এসব নাগরিক পরিষেবার বিষয়েও বিশেষ নজর দিতে হবে।  কিন্তু করোনা মহামারীতে সংক্রমণ দিন দিন বাড়তে থাকা এবং ঢাকা মহানগর কার্যত পুরোপুরি লকডাউনে চলে গেলেও বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়রদের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থায় অন্তত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার কাজটিও যদি মেয়ররা যথাযথভাবে সম্পন্ন করেন তাহলেও নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক কমে আসতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর মেয়ররা কি জাতির এই মহাদুর্যোগে আন্তরিকভাবে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটির দায়িত্ব নেবেন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত