বিশ্বজুড়ে মহামারী রূপে দেখা দেওয়া করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না রাজধানীবাসী। ফলে রাজধানীর সড়কগুলো প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সন্ধ্যার পর কিছু কিছু রাস্তার গলির মুখে দল বেঁধে ওঁৎ পেতে থাকছে ছিনতাইকারী। সুযোগ পেলেই পথচারীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ঘড়ি ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিচ্ছে তারা। কিন্তু এরপরও নিতান্তই জরুরি প্রয়োজনে অনেকেই ঘরের বাইরে বের হতে বাধ্য হচ্ছেন। ফাঁকা রাস্তায় ছিনতাই আতঙ্কের মধ্যেই চলাচল করছেন এসব পথচারী।
ছিনতাইয়ের কবলে পড়া ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, অতীতের তুলনায় রাজধানীতে চুরি-ছিনতাই এখন অনেকটাই কমেছে। বাড়ানো হয়েছে পুলিশের টহল।
গত বৃহস্পতিবার রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার সময় রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন সাহাদাত পারভেজ নামে এক গণমাধ্যমকর্মী। গতকাল শুক্রবার ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিজের ফেইসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। সেখানে লেখেনÑ ‘প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, এই করোনাকালে (করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়) আপনারা যারা পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে রাতে বাসায় ফেরেন, তারা একটু চোখ কান খোলা রেখে সাবধানে চলাফেরা করবেন। গতকাল রাত পৌনে ১১টার দিকে বাইকে করে বাসায় ফেরার সময় কারওয়ান স্টার হোটেলের কাছের রাস্তায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ি। ওরা আমাকে জোর করে মোটরবাইক থেকে নামানোর চেষ্টা করে। আমি দ্রুত বাইক টান দিয়ে নিরাপদে চলে আসি। এই সময়ে রাস্তা খুবই নীরব ও নি®প্রাণ থাকে।’
গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় কথা হয় একটি বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মো. সালাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু জরুরি ওষুধ ও বাচ্চাদের জন্য চকলেট কিনতে বাসা থেকে বের হয়েছি। রাস্তা একেবারেই ফাঁকা। যে গলি দিয়ে এসেছি তার ভেতরে চার থেকে পাঁচজন যুবক বসে আছে দেখলাম। এমন পরিস্থিতিতে এরা কেন বসে আছে তা জানি না। তবে তাদের দেখে যে কারও ভয় লাগার কথা।’
রাজধানীর ইস্কাটনে নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সামনে থেকে হলিফ্যামিলি হাসপাতালের সামনের সড়কেও গতকাল সন্ধ্যার পর জায়গায় জায়গায় চার-পাঁচজন মিলে দল বেঁধে দাঁড়িয়েথাকতে দেখা যায় কিছু যুবক ও কিশোরকে। তাদের গতিবিধি ছিল সন্দেহজনক। ফাঁকা সড়কে ছিনতাই বাড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) কৃষ্ণ পদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা একটি বিশেষ অবস্থা। এই অবস্থায় অপরাধ কম হওয়ার কথা। কিন্তু তার পরও কিছু অপরাধী আছে তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের নির্দেশনা আছে।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যেকোনো ক্রাইমের বিরুদ্ধে কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। যখন যে পরিস্থিতি হয় সেই পরিস্থিতিতে কী ধরনের ক্রাইম হতে পারে তার ওপর ভিত্তি করে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যারা ভুক্তভোগী আছেন তারা যদি অভিযোগ করেন তাহলে আমরা অপরাধের ধরন বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারি।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় অন্তত ২০০ স্পটে তিন শতাধিক ছিনতাইকারী সবসময় সক্রিয় অবস্থানে থাকে। প্রতি মাসে অসংখ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়। আবার প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক হয় ছিনতাইকারী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক রাতের বিশেষ অভিযানে রাজধানীর কয়েকটি এলাকা থেকে ৪২ জন ছিনতাইকারীকে আটক করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ। ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে রাজধানীতে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১৯টি। আর ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি। জানুয়ারিতে চুরি হয় ১৩৮টি আর সিঁধেল চুরি হয় ৬৫টি। ফেব্রুয়ারিতে ১১৩টি চুরি ও ৭৪টি সিঁধেল চুরি হয়।
ডিএমপিতে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছিনতাইকারীদের একমাত্র পেশা ছিনতাই। ফলে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতেও তারা সুযোগ পেলেই ছিনতাই করবে এটাই স্বাভাবিক। রাতারাতি তারা ভালো হয়ে যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’
