শিশু ওয়ার্ডের শয্যায় ঘুমাচ্ছে বিড়াল

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২০, ০৬:১৯ এএম

করোনাভাইরাস আতঙ্কে মাদারীপুরের হাসপাতালগুলোতে কমে গেছে রোগীর সংখ্যা। একশ শয্যা সদর হাসপাতালের বেশিরভাগই এখন ফাঁকা। গতকাল শুক্রবার সকালে রোগীশূন্য শিশু ওয়ার্ডের একটি বিছানায় বিড়াল ঘুমাতে দেখা গেছে। এছাড়া বাগেরহাট সদর হাসপাতালও এখন প্রায় রোগীশূন্য। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জুনায়েদ সাফার মাহমুদ বলেন, ‘খুব বেশি অসুস্থ না হলে কেউ হাসপাতালে আসছে না। ভিড় এড়াতে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শের জন্য আমরা হটলাইন চালু করেছি। আমরা তাদের টেলিমেডিসিন মাধ্যমে জরুরি সেবা দিচ্ছি।’

সরেজমিন গতকাল সকাল ১০টার দিকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে দেখা যায়, রোগীশূন্য জরুরি বিভাগে নেই চিকিৎসক। নার্স ও চিকিৎসকের সহকারী তিনজন বসে আছেন। নিচতলায় শিশু ওয়ার্ডে গিয়েও দেখা মেলেনি কোনো রোগী। একটি বিছানায় বিড়াল ঘুমাতে দেখা গেছে। নারী ওয়ার্ডে ছিল মাত্র

তিনজন রোগী। দ্বিতীয় তলায় পুরুষ ওয়ার্ড ফাঁকা। সার্জারি ওয়ার্ড ছিল পুরোটাই ফাঁকা। তবে তৃতীয় তলার লেবার ওয়ার্ডে রয়েছেন কয়েকজন রোগী। চিকিৎসকের দেখা না পেলেও রোগীদের দেখাশোনা ও সেবা দিচ্ছেন নার্সরা।

নারী ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ এক নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা আতঙ্কে গত তিন দিন ধরে রোগী ক্রমেই কমছে। তাই চিকিৎসকও তেমন নেই। তারা সকালে এসে ঘুরে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারী ওয়ার্ডে শয্যা ২২টি। ১০ দিন আগেও রোগীদের জায়গা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হতো। এখন মাত্র তিনজন রোগী।’

ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিয়ে ভর্তি এক শিশুর মা বলেন, ‘আমি তিন দিন পুরো শিশু ওয়ার্ডে একাই ছিলাম। হাসপাতালে সুনসান নীরবতা। কোনো হইচই নেই। লোকের সমাগম নেই। এ কারণে অনেকটা ভয় হয়।’

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে মাদারীপুর জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। পাশাপাশি দেশ ও পরিবারের স্বার্থে বিদেশফেরত সবাইকে ১৪ দিন নিজ বাড়িতে কোয়ারেন্টাইন থাকতে হবে। সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অখিল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামান্য সর্দি, কাশি, জ¦র হলেও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ছুটে আসছেন। এতে করোনাভাইরাস আতঙ্কে অন্য রোগীদের সমস্যা হচ্ছে। এ কথা বিবেচনা করে এ ধরনের রোগীদের মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে একদিকে রোগীদের যেমন সময় বাঁচবে, তেমনই করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকিও কম থাকবে। তাই যেকোনো স্বাস্থ্যগত পরামর্শের জন্য ০১৯১৪০৯৩৯৪১-এ নম্বরে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগের অনুরোধ রইল। প্রয়োজনে গুরুতর রোগীদের ভর্তিও করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতে রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে না।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত মাদারীপুরে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিল ১ হাজার ৩৫০ জন, হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে ছিল ৩ জন। সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে ছিল ৩ জন। সকালে হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে থাকা ৩ জন রিলিজ পেয়েছে এবং সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকা ৩ জনের মধ্যে দুজন রিলিজ পেয়েছে। এ পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে রিলিজ পেয়েছে ৮৪৮ জন।

সিভিল সার্জন মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে খুবই করোনার ঝুঁকিতে রয়েছে মাদারীপুর। তাই সদর হাসপাতাল ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীরা ভর্তি হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা দিনরাত কাজ করছি।’

এদিকে প্রতিদিন বাগেরহাট সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে কয়েকশ রোগী সেবা নিতে এলেও সেটি এখন ফাঁকা। খুব বেশি অসুস্থ না হলে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে না। সেজন্য বেডগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সব ধরনের রোগীকে সেবা দিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছেন।

গতকাল সকাল ১০টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্যাভলন স্প্রে করছেন। বহির্বিভাগে নেই রোগীর লাইন। জরুরি বিভাগে থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সেখানেও কোনো রোগী নেই। একশ শয্যার এই হাসপাতালের গাইনি, শিশু, মেডিসিন, অর্থোপেডিক্সসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের বেডগুলোও রোগীশূন্য।

জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জুনায়েদ সাফার মাহমুদ বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের চলাচল সীমিত রয়েছে। খুব বেশি অসুস্থ না হলে কেউ হাসপাতালে আসছে না। তারাই আসছে যাদের বাড়িতে বসে চিকিৎসাসেবা নেওয়া সম্ভব নয়। ভিড় এড়াতে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শের জন্য আমরা হটলাইন চালু করেছি। হটলাইনে আমরা তাদের টেলিমেডিসিন মাধ্যমে জরুরিসেবা দিচ্ছি। আমরা সব ধরনের রোগীর সেবা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।’ তবে সাধারণ রোগের জন্য হাসপাতালে না এসে হটলাইনে সেবা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ডা. কেএম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সরকার সবাইকে ঘরে থাকতে বলেছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কাউকে হাসপাতালে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এজন্য সদর হাসপাতালে রোগী অনেক কমে গেছে। আমরা হটলাইন চালু করেছি, সেখানে যোগাযোগ করলে রোগীরা সেবা পাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত