দেশে করোনা রোগী বাড়ছে। স্থানীয় সংক্রমণ থেকে রোগটি সীমিত আকারে হলেও কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই মোট আক্রান্তের ১০ শতাংশের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত করোনার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সময় বলে মনে করছেন। এ সময় প্রথম দফায় আক্রান্তদের থেকে দ্বিতীয় দফায় নতুন করে সংক্রমণ এবং তাদের থেকে সামাজিকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর হলো, এ সময় সেটা বোঝা যাবে।
দেশে রোগটির বিস্তার ঘটছে এমন তথ্য জানিয়ে আইইডিসিআরও করোনা শনাক্তে পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে। আগামী দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকাসহ সারা দেশে ১২টি ল্যাবরেটরিতে করোনা পরীক্ষা করা যাবে বলে তারা জানিয়েছে। সেই সঙ্গে বিদেশফেরতদের পাশাপাশি তাদের সান্নিধ্যে আসা এবং কমিউনিটি লেভেলে ছড়িয়ে থাকা নিউমোনিয়া রোগীদেরও পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে।
সরকারও পরিস্থিতি সামাল দিতে রোগটির বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি চিকিৎসার প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। সারা দেশে আইসোলেশন বেড স্থাপনের কাজ চলছে। ঢাকায় ১০টি হাসপাতালকে করোনার চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিশেষ করে করোনার জটিল রোগীদের চিকিৎসায় আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটর মেশিন বসানোর কাজ চলছে। চিকিৎসকরা যাতে সুরক্ষিত থেকে চিকিৎসা দিতে পারে সে জন্য পিপিই (সুরক্ষা পোশাক) সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগ সন্তোষজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লকডাউনের মধ্য দিয়ে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে রোগটির বিস্তার কিছুটা হলেও ঠেকানো যাবে। কিন্তু সরকারকে চিকিৎসার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে হাসপাতালগুলোতে করোনার জন্য পৃথক ইউনিট প্রস্তুত রাখতে হবে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর মেশিন বাড়াতে হবে। সব ধরনের সুরক্ষা দিয়ে চিকিৎসকদের প্রস্তুত রাখতে হবে। নতুবা রোগী বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে করোনায় আক্রান্ত রোগীর কমপক্ষে ১০-২০ শতাংশের অবস্থা জটিল হতে পারে। তাদের জন্য আইসিইউ লাগবে। এসব রোগীর জন্য ভেন্টিলেটর লাগবে। অথচ জনসংখ্যা অনুপাতে আমাদের আইসিইউ বেড বা ভেন্টিলেশন সুবিধা একেবারেই কম। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বেডের সংখ্যা শিগগিরই বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রাখতে হবে। তা না হলে সামনের দিনগুলোতে বিপদ হতে পারে। আমরা এখনো জানি না, সামনের দিনগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ রোগী হতে পারে। কারণ পরীক্ষার পরিধি এখনো অতটা বাড়েনি।
আইসিইউ বেড মাত্র ২৯টি : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার জটিল রোগীদের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত মাত্র ২৯টি আইসিইউ বেড নিশ্চিত করা গেছে। এর সবই ঢাকায়। এমনকি সরকার করোনা রোগীদের জন্য ঢাকায় যে ১০টি হাসপাতালকে নির্দিষ্ট করেছে, তার মধ্যে পাঁচটি হাসপাতালে এই আইসিইউ বেড রয়েছে। বাকিগুলোতে কোনো আইসিইউ বেড, এমনকি ভেন্টিলেটর মেশিনও নেই।
ঢাকার যে ১০টি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হবে এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আইসোলেশন বেড রয়েছে ২০০ ও আইসিইউ ১০, বাবুবাজারের মহানগর জেনারেল হাসপাতালে ১৫০ বেড থাকলেও এখনো কোনো আইসিইউ নেই। মিরপুরের মা ও শিশু হাসপাতালে ২০০ বেড রয়েছে, তবে আইসিইউ নেই। কাঁচপুরের সাজেদা ফাউন্ডেশনে রয়েছে ৫০টি বেড এবং আইসিইউ রয়েছে ০৫টি। মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালে বেড আছে ৫০টি এবং আইসিইউ ০৩। উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে বেড ৫০ এবং আইসিইউ ০৩টি। এ ছাড়া মহাখালীর রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বেড রয়েছে ২৫০টি এবং আইসিইউ ৮। কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতালে ১০০টি বেড থাকলেও কোনো আইসিইউ নেই। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ১৬টি ও শেখ রাসেল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ ডিজিজেস হাসপাতালে আটটি ভেন্টিলেটর মেশিন এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ বেড বাড়ানো হচ্ছে বলে গতকাল শনিবার আইইডিসিআর জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক আমিনুল হাসান বলেন, আমরা আরও কিছু আইসিইউ প্রস্তুত করার কাজ করছি। ঢাকা মেডিকেলে ২৫টি আইসিইউর প্রস্তুতিতে কাজ করছি। বিশেষ করে আটটি বিশেষায়িত হাসপাতাল পুরোপুরি প্রস্তুত হলে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য মোট শয্যা সংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজারের বেশি। আর আইসিইউ বেড হবে পঁয়তাল্লিশটি। প্রয়োজনে হাসপাতাল, শয্যা ও আইসিইউর সংখ্যা বাড়ানো হবে।
পূর্ণ প্রস্তুত মাত্র একটি হাসপাতাল, অন্যগুলোতে শুধু বেড : দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এখনো মাত্র একটি হাসপাতালেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। অর্থাৎ করোনা চিকিৎসায় এখনো রাজধানী কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালেই পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। এখানে আইসোলেশন বেড রয়েছে ২০০টি এবং আইসিইউ ১০টি। আরও ১৬টি বেড প্রস্তুতের কাজ চলছে। রাজধানীর বাকি ৯টি হাসপাতালে ৮৫০টি আইসোলেশন বেড ছাড়া আর কিছুই নেই। এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, চিকিৎসক-নার্স ও হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছায়নি। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়ার সুবিধা বা ভেন্টিলেশন জরুরি। কিন্তু নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর সবগুলোতে এসব সুবিধা নেই। অন্য হাসপাতালে প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আমিনুল হাসান। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল এবং আরও কয়েকটি হাসপাতালে ৯০টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে আরও চার হাসপাতালে ১৯টি বেড স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে বলেও জানান তিনি।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সরঞ্জাম সরবরাহকারী সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপোর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদুল্লাহ জানান, সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে ৩৬টি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা হয়েছে। এখন মোট ১৬৪টি ভেন্টিলেটর আছে।
অন্যান্য আইসিইউ করোনা রোগীদের জন্য নয় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫ হাজার ৫৫টি। এসব হাসপাতালে বেড রয়েছে ৯০ হাজার ৫৮৭টি। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি। এখানে বেড রয়েছে ৫১ হাজার ৩১৬টি। অন্যদিকে, সরকারি আইসিইউ বেড রয়েছে ৪৩২টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২২টি ও ঢাকার বাইরে ১১০টি। একইভাবে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড রয়েছে ৭৩৭টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৪৯৪টি ও ঢাকার বাইরে ২৪৩টি।
তবে এসব আইসিইউতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, করোনা খুবই সংক্রামক ব্যাধি। তাদের জন্য আলাদা আইসিইউ লাগবে। পৃথক আইসোলেশন লাগবে। সাধারণ আইসিইউতে তাদের অন্য রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না।
সাধারণ বেড ছাড়া কিছুই নেই ঢাকার বাইরে : করোনাভাইরাসে সংক্রমিত সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসায় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু করোনার চিকিৎসায় এ সুবিধা রয়েছে শুধু রাজধানীতেই। এর বাইরে সাধারণ বেড ছাড়া অন্য কোনো সুবিধাই নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৫১৫টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রস্তুত করা হয়েছে ১ হাজার ৫০টি। ঢাকার বাইরে কোনো আইসোলেশন ইউনিটে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন সুবিধা দেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০০টি আইসিইউ বেড তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি ভেন্টিলেটর স্থাপনের কাজ চলছে। করোনা পরিস্থিতি সার্বিক বিবেচনা করে সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের নির্ধারিত হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হবে। সেখানে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য সুবিধা থাকতে হবে। বিশেষ করে এখনো করোনায় অধিক ঝুঁকিতে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মৃত্যুবরণ করা ৫ করোনা রোগীর সবার বয়স ৬০ থেকে ৭৫ বছর। মোট আক্রান্ত ৪৮ জনের মধ্যে ১০ জনেরও বেশি ষাটোর্ধ্ব। এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের হিসাব বলছে, দেশের ১৬ কোটি ৪৬ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রবীণদের নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কমপক্ষে ২শ আইসিইউ বেড প্রস্তুত রাখতে হবে। করোনা হাসপাতালগুলোতে সব সুবিধা রাখতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে চিকিৎসাসুবিধা বাড়াতে হবে। বাইরের রোগী ঢাকায় পাঠাতে গেলে জটিলতা বাড়বে।
