করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নির্দেশনা না মেনে চালু রাখায় রাজধানীর মিরপুরের একটি কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে বিক্ষোভের মুখে সিরাজ গার্মেন্টস কর্র্তৃপক্ষ আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে। একইভাবে শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে গাজীপুরের বেশ কয়েকটি কারখানা একই সময় পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া নির্দেশনা মোতাবেক ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ডিইপিজেড) সাভার-আশুলিয়ার বেশিরভাগ মালিক কারখানা বন্ধ করলেও, এখনো অনেকে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিদেশি ক্রেতাদের কিছু ক্রয়াদেশ থাকায় মিরপুর-১০ গোল চত্বরের কাছে সেনপাড়া পর্বতা এলাকার সিরাজ গার্মেন্টসটি চালু রাখতে চেয়েছিলেন মালিকপক্ষ। কিন্তু করোনা আতঙ্কে শ্রমিকরা কারখানা বন্ধের দাবিতে শনিবার সড়কে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ছুটির ব্যবস্থা করে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তা মনসুর আহমেদ জানান, মিরপুরে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত কোনো কারখানায় ছুটির দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে বলে তার জানা নেই। সিরাজ গার্মেন্টস আগে সদস্য থাকলেও, এখন হয়তো বাতিল রয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনে ঢাকা, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে। আশুলিয়ায় স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী তৈরিতে যুক্ত কয়েকটি কারখানা চালু রাখতে চাইলেও শ্রমিকদের অনীহায় তা বন্ধ করা হয়েছে।
গাজীপুরে সড়ক অবরোধ : সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর ও আইডিকার্ড জমা রেখে কারখানা থেকে বের করার প্রতিবাদে গতকাল সকালে গাজীপুর সদর উপজেলার জাহিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নেয়।
কারখানার সুইং অপারেটর মাহমুদা বেগম জানান, গত বুধবার বিকেলে কাজ চলাকালে কয়েকজন শ্রমিককে উৎপাদন ব্যবস্থাপক (পিএম) ডেকে নিয়ে যান। পরে তিনি পৃথকভাবে ডেকে প্রত্যেকের থেকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেন এবং কারখানার আইডিকার্ড রেখে দেন। কোনো কারণ ছাড়াই বেতন না দিয়ে শ্রমিকদের বের করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে কারখানার পিএম মো. রফিকুল ইসলামকে একাধিকবার মোবাইলফোনে কল দিলেও, তিনি রিসিভ করেননি। তবে কারখানার জিএম এখলাছুর রহমান মুকুল জানান, সাদা কাগজে স্বাক্ষর ও কার্ড নেওয়ার তথ্য সঠিক নয়। কয়েকজন মূলত ছুটি দাবি করে কারখানায় অসন্তোষ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।
এদিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকায় টিআরজেট গার্মেন্টস, শ্রীপুর গুলশান স্পিনিং মিলস, এ ইয়ার্ন মিলস, টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বেইস ফ্যাশন লিমিটেড বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। তারা গতকাল সকালে কাজে যোগ দিতে এসে ছুটির দাবি জানালে কর্র্তৃপক্ষ অসম্মতি প্রকাশ করে। পরে সড়কে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। একপর্যায়ে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে।
গাজীপুর শিল্পপুলিশের পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান জানান, করোনা আতঙ্কে মহানগরীর কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ছুটির ব্যবস্থা করা হয়।
সাভারে ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ : করোনা প্রতিরোধের সতর্কতা হিসেবে ডিইপিজেডসহ সাভার-আশুলিয়ায় অধিকাংশ শিল্পকারখানা আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছেন মালিকরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা শিল্প পুলিশ-১ ও ডিইপিজেড কর্র্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
সরেজমিন সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার সামনে গিয়ে মূল ফটকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানায় সাধারণ ছুটির নোটিস ঝোলানো দেখা যায়। এ বিষয়ে সাভারের উলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন জানান, সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ কারখানার পার্শ্ববর্তী আল ইসলাম, এইচআর গ্রুপসহ বেশ কিছু কারখানা স্বল্প পরিসরে খোলা পাওয়া যায়।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘এখনো সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। কারখানার পরিবেশ ও বর্তমান স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এগুলো বন্ধ করা দরকার।’
ঢাকা শিল্পপুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সানা সামিনুর রহমান শামীম জানান, সাভার-আশুলিয়ার ৮০ শতাংশ কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। তবে যেসব কারখানা খোলা রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সোবাহান জানান, চালু কারখানাগুলোর বিষয়ে রবিবার (আজ) সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
গত বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের সুরক্ষায় বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক মালিকদের প্রতি কারখানা বন্ধের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সরকারের সাধারণ ছুটির সময়ে কারখানা বন্ধ রাখা যেতে পারে। তবে কেউ চাইলে খোলা রাখতে পারবেন। এজন্য কারখানাগুলোকে শ্রমিকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং শ্রমিকদের সব দায়িত্ব মালিকদের নিতে হবে।’
