করোনার চেয়েও বেশি মন্দার আতঙ্কে আছি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২০, ০৯:৩৫ পিএম

এ পৃথিবী কখনো দেখতে হবে ভাবিনি। ভাবা দূরে থাক, দুঃস্বপ্নেও মনে আসেনি এমন এক বিবর্ণ পৃথিবীর ছবি দেখতে হবে। কলকাতায় শুনেছি একসময় প্লেগ মহামারী চেহারা দেখিয়েছিল। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমার ভয়ে লাখ লাখ লোক কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আজও প্রবীণদের স্মৃতিতে, গানে-কবিতা-নাটকে অমর হয়ে আছে। বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন, ছেঁড়া তার নাটক, তৃপ্তি মিত্রের ‘ফ্যান দাও ফ্যান দাও আকুতি’ বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মহতী সাহিত্যিকের ‘ছিনিয়ে খায় না কেন’ গল্প আজও বাংলা শিল্প-সাহিত্যে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ বা হিন্দু-মুসলমানের ভাতৃঘাতী দাঙ্গার কথাও কলকাতা ভোলেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতাও যুদ্ধ-দাঙ্গা তীব্র গণআন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। ভোলা যায় না নকশাল আন্দোলনের সেই অগ্নিগর্ভ সময়কে। কিন্তু এ কলকাতা একদম অন্যরকম। বিবর্ণ প্রাণহীন এক মৃত্যুপুরী।

কোথাও কোনো প্রাণের শব্দ নেই। গাছে গাছে নতুন সবুজ পাতা এসেছে। একমনে কোকিল ডাকছে। ঝকঝকে নীল আকাশে সাদা বক উড়ে যাচ্ছে। যে জায়গায় আমি থাকি তা এমনিতেই শান্ত নির্জন। নতুন গড়ে ওঠা এক পরিকল্পিত টাউনশিপ। যার গা থেকে এখনো পুরোপুরি গ্রামের গন্ধ যায়নি। এখানে এখনো সবুজ হারিয়ে যায়নি। উঁচু মাঝারি নানা ক্যাম্পাস। আধুনিকতার কত আড়ম্বর। লিফট, মাল্টিজিম, পার্ক, সুইমিং পুল, কমিউনিটি হল, সিকিউরিটির লাল চোখ। সন্ধ্যে নামতে না নামতেই বাচ্চাদের খেলার চিলচিৎকার। এখন সব থেমে গেছে। কাছের গ্রাম থেকে যে ছেলেটি ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে আসে, সে এখনো আসছে। রোজ নয়। সপ্তাহে দুদিন মাত্র। ওর মুখে মাস্ক। চোখদুটো ভারি বিষণœ। মাছওয়ালার দেখা নেই। যে বুড়ি মাসির দোকানে চা খেতাম। গরম আলুর চপ ভালোবাসতাম। সে কোথায় চলে গেছে দোকান বন্ধ করে। যে তরুণটি রাস্তায় মুরগি বেচত সেও নেই। টোটো নেই। অটো নেই। বাস নেই। গাড়ির শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে শুধু পুলিশের আনাগোনা। লকডাউন না মেনে কেউ পথে বেরিয়েছে কি না সেই নজরদারি করতে।

আমরা এখন অনেকেই কঠোর অনুশাসন মেনে চলতে ফতোয়া জারি করছি। মূলত ফেবুতে। আমরা বলতে ওই অধিকাংশ বাবু ভদ্দরলোকেরা। যাদের অধিকাংশের কাছেই দুনিয়া হচ্ছে খিড়কি থেকে সিংহ দুয়ার অবধি। তাদের বড় অংশ কখনো কলকাতার বিস্তীর্ণ বস্তি এলাকা সম্ভবত দেখেননি। মুরারিপুকুর, বাগমারি, তিলজলা, ট্যাংরা, পিকনিক গার্ডেন, শ্যামবাজার, খান্নার অধিকাংশ বস্তিতে ঘর একটাই। লোকসংখ্যা আট থেকে আঠেরো। ঘরে একটা বড় খাট। গাদাগাদি করে সেখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঘুমোতে যান। কোনো কোনো বস্তিতে আবার খাটের ওপরে বাবা-মা শোন। সঙ্গে কোলের ছেলে বা মেয়ে। নিচে শোয় ছেলে ও তার সবে বিয়ে করা বউ। এই সামাজিক কাঠামোয় কেউ কেউ রাস্তায় ঘুরলে পুরো দোষ দেওয়া যায় না। কখনোই লকডাউন ভেঙে বের হওয়াকে সাপোর্ট করছি না। কিন্তু সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বাদ দিয়ে এটা করুন, ওটা করবেন না, বলে যে মধ্যবিত্ত-হুমকি তা কিন্তু সবসময় যুক্তিযুক্ত নয়। যে দেশে, যে শহরে এমন চূড়ান্ত অশ্লীল অর্থনৈতিক বৈষম্য সেখানে এমন কিছু কিছু বিশৃঙ্খলা ঘটবেই।

করোনা নিয়ে যতটা আতঙ্কে আছি, তারচেয়ে কম আতঙ্কে নেই অর্থনীতি নিয়ে। ইতিমধ্যেই অর্থনীতি ভেঙেপড়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট। স্থানীয় বাজারে গত কয়েক দিন হুড়োহুড়ি করে মাছ-মাংস-সবজি কেনার ধুম পড়েছিল। কে জানে কাল পরশু এটুকুও জুটবে কি না সে ভয়ে ব্যাগ ভর্তি জিনিস কিনছিল মানুষ। দুদিন পরে আজ সব বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখছি উৎসাহে ভাটা পড়েছে।

তার কারণ পকেটে পয়সা নেই। এখনো যেটুকু যা আছে তাতে কদিন কীভাবে চলবে কেউ জানে না। ভারতে আজও শ্রমবাজারে সংগঠিত শিল্প শ্রমিক ছয়-সাত শতাংশ মাত্র। বাকি সব অসংগঠিত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এমনিতেই ‘নোট বন্দি’ বা ‘ডিমনিটাইজেশন’ বাজারে ধস নামিয়েছিল। সেখান থেকে চেষ্টা চরিত্তির করে বাজার যতটুকু ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল এই করোনা লকডাউন পুরোপুরি তা শেষ করে দিল। ভারতের অর্থনীতি গত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল; এখন তা কোন তলানিতে ঠেকবে কেউ বলতে পারছে না। অর্থনীতিবিদদের অনেকের আশঙ্কা ‘জিডিপি গ্রোথ’ আর কিছু দিন বাদে ৩-এর নিচে নেমে যেতে পারে। রিয়েল এস্টেট, হোটেল-ট্যুরিজম-রেস্তোরাঁ, বিমান, পরিবহন সব ক্ষেত্রেই এর মধ্যেই প্রবল ধস নেমেছে। লাখ লাখ লোক বেকার হয়ে গেছে। কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। মারুতি সুজুকি হুন্ডাই নামকরা সব গাড়ি শিল্প এখানে বন্ধ হয়ে গেছে। ‘ওলা’, ‘উবার’-এর মতো অ্যাপনির্ভর পরিবহনে এখন অবধি ছাঁটাই হয়েছেন ৪২ শতাংশের ওপর গাড়িচালক।

গর্বের আইটি সেক্টরের অবস্থাও খারাপ। অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যেই অর্ধেক মাইনে নিয়ে কাজ করতে বলছে কর্মচারীদের। অসংগঠিত শিল্পে তো এখনই হাহাকার দেখা দিয়েছে। নির্মাণ, কৃষি, ইটভাটা, জরি, রেডিমেড গার্মেন্টস, সব শিল্পে অন্ধকার নেমে এসেছে। অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক সব শিল্প থেকেই ছাঁটাই হচ্ছে।

এদেশের অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর। গ্রামীণ পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তার বড় কারণ বিভিন্ন রাজ্যের অসংখ্য শ্রমিক চাকরি খুইয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছে, হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটাই চাঙ্গা থাকে এই ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের আয়ে। বিপুল সংখ্যক লোকজন চলে আসায় চাপ বাড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতে। কৃষি এমনিতেই কয়েক বছর ধরে সংকটের মুখে। ফসলের ঠিকঠাক দাম না পাওয়ায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সরকার গ্রামে গ্রামে ‘সবজি মান্ডি’ বা বাজার করেছিলেন, যাতে অন্তত ধান ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় ফসলের দাম পায় চাষি। আমাদের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় এই সৎ উদ্দেশ্যও মাঠে মারা যেতে বসেছিল। তবু কিছুটা যা কাজ হচ্ছিল তাও এখন বন্ধ পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায়। ফলে দ্বিগুণ উৎসাহে গ্রামীণ মহাজনী ব্যবস্থা ফিরে এসেছে কৃষকদের পথে বসাতে। গ্রামীণ সমাজে স্থানীয় হাটের গুরুত্ব অপরিসীম। এখন এই লকডাউনে সব জায়গায় হাট বসতে পারছে না। ফলে স্থানীয় কেনাবেচা আটকে গিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে। কলকাতার মাছের বড় জোগানদার অন্ধ্রপ্রদেশ। এক সময় পূর্ব কলকাতা জলাভূমি শহরের ছোট মাছ ও সবজির জোগান দিত। এখন তথাকথিত উন্নয়ন জলাভূমি বুজিয়ে একের পর এক হোটেল, ফ্ল্যাট বানাবার ফলে সেই জোগান আর আগের মতো নেই। শহরকে গৃহপরিচারিকা জোগান দেয় ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর, সোনারপুর, তালদি, চম্পাহাটির মতো দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রাম। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ কাজে আসতে পারছেন না। বলাবাহুল্য অধিকাংশের সঞ্চয় নেই। এক দু’মাস কোনো কোনো বাড়ি থেকে টাকা দেবে। সবাই নন। যারা দেবেন তারাও কতদিন দেবেন বা দিতে পারবেন বলা মুশকিল। তখন কী হবে তা নিয়ে সব জায়গায় গরিব মানুষের রাতের ঘুম চলে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে সামাজিক সংকট বাড়ার খবর আসছে। কোথাও কোথাও পারিবারিক অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া কদর্য চেহারা নিচ্ছে। ঘরে টাকা নেই। চাকরি চলে গেছে। কবে সব কিছু স্বাভাবিক হবে ঠিক নেই। মনের এই উদ্বেগ অশান্তি বিবাদ ডেকে আনছে। করোনা এখনো ভারতে দু’নম্বর স্টেজে আছে। তিন নম্বর স্টেজে গেলে ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে বলে ডাক্তারদের আশঙ্কা। এটা নিয়ে চর্চা আলোচনা এখন সারা দুনিয়ায়। কিন্তু পাশাপাশি খুব উদ্বেগজনক আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। আসন্ন প্রবল মন্দা আমাদের কোন অন্ধকারে নিয়ে যাবে কল্পনা করতেও ভয় পাচ্ছি।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত