১৭ মার্চ থেকেই বলতে গেলে অখন্ড অবসরের শুরু। করোনাভাইরাসের কারণে এখন বাসাতেই সময় কাটছে। গত কয়েক বছরের ব্যস্ততা না থাকায় পরিবারের সদস্যদের দিতে পারছেন সময়। তবে ঘরে থাকলেও সারা দেশে বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাওয়া ‘সন্তানদের’ ভাবনাতেই কাটে মহিলা ফুটবল দলের প্রধান কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের। সাবেক এই ফুটবলারের চোখে তার শিষ্যরা সবাই সন্তানতুল্য। তাই তো প্রতিদিন নিয়ম করে ফোনে খোঁজখবর নিচ্ছেন করোনার কারণে ক্যাম্প ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে চলে যাওয়া ফুটবলারদের। এর সঙ্গে আরেকটা দুশ্চিন্তা মাথায় ঢুকে গেছে তার। পরশু প্রকাশিত র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪তম। ডিসেম্বরে সর্বশেষ র্যাংকিংয়ের চেয়ে চার ধাপ বেড়েছে র্যাংকিং। এভাবে বাড়তে বাড়তে এক সময় না ফের র্যাংকিংয়ের বাইরে চলে যেতে হয় বাংলাদেশকে। তাই র্যাংকিংয়ে টিকে থাকতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে ম্যাচ খেলার তাগিদ দিচ্ছেন ছোটন।
এই ম্যাচ খেলা নিয়েই যত সমস্যা। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছে ২০১৯-এর মার্চে, নেপালের বিরাটনগরে, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া বাংলাদেশের মেয়েদের এরপর থেকে শুরু অপেক্ষা। মাঝখানে সুযোগ এসেছিল ডিসেম্বর ১৩তম এসএ গেমসে খেলার। কিন্তু সেই সুযোগটা মেয়েদের দেয়নি বাফুফে। দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার যুক্তি ছিল- বাংলাদেশের মেয়েরা সাফ, এসএ গেমসের মতো আসরের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। অথচ কাঠমান্ডু ও পোখারায় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে খেললে আর কিছু না হোক ব্রোঞ্জপদক তো জিততে পারত বাংলাদেশ। এ নিয়ে প্রশ্ন করতেই এড়িয়ে গেলেন বাফুফের স্থায়ী কোচদের একজন ছোটন, ‘এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ তবে সিনিয়র পর্যায়ে ম্যাচ খেলার সুযোগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন ছোটন, ‘র্যাংকিংয়ে চারধাপ নিচের নেমে যাওয়ায় হয়তো অনেকে অনেক প্রশ্ন করছেন। আমি কিন্তু র্যাংকিংয়ে পতন নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। ম্যাচ না খেললে তো র্যাংকিং খারাপ হবেই। আমি চিন্তিত র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের নামটা টিকিয়ে রাখা নিয়ে। এক বছর হয়ে গেল সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছে দল। মার্চে ফিফা ফ্রেন্ডলি উইন্ডো করোনার কারণে ব্যবহার করা যায়নি। জুনে ফের ফিফা ফ্রেন্ডলি উইন্ডো খুলবে। সে সময় অন্তত দু’টি ম্যাচ খেললে র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের নামটা টিকে যাবে। তার জন্য এখন থেকেই কাজে নেমে পড়তে হবে।’
সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণারানী সরকার, সিরাত জাহান স্বপ্নাসহ বেশ ক’জন মেয়ে এর মধ্যেই অনূর্ধ্ব-১৯ বছর অতিক্রম করে ফেলেছে। সুবাদে তাদের আর বয়সভিত্তিক দলে খেলার সুযোগ নেই। ছোটন মনে করেন এই মেয়েদের ধরে রাখতে হলে জাতীয় দলের ম্যাচ খেলার বিকল্প নেই, ‘সাবিনা, কৃষ্ণাসহ প্রায় ১০-১২ জন মেয়ে জাতীয় দলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আর কিছুদিন পর মারিয়া মান্ডা, সানজিদারাও ১৯ অতিক্রম করবে। তাদের এখন খেলার সুযোগ দিতে হবে। আমি মনে করি করোনার প্রকোপ কমে গেলে সিনিয়র দলকে প্রস্তুত করার দিকে নজর দিতে হবে আমাদের। এর সঙ্গে বাফুফের উচিত হবে এখন থেকেই জুনের উইন্ডোতে দু’টি ম্যাচ আয়োজনের চেষ্টা করা। নইলে পরে আর প্রতিপক্ষ পাওয়া যাবে না।’
দীর্ঘদিন পর শুরু হয়ে করোনার কারণে স্থগিত হয়ে গেছে মেয়েদের ফুটবল লিগ। জাতীয় দলের ১৯জন খেলোয়াড় আছেন বসুন্ধরা কিংসে। এছাড়া এফসি উত্তরবঙ্গে আছে ৮ জনের মতো। এরা ছাড়াও বাফুফে ভবনের আবাসিক ক্যাম্পে ছোটনের অধীনে আছে আরও ৮০ জনের মতো মেয়ে। সব মিলিয়ে ৮০ থেকে ৯০ জন মেয়ে নিয়ে চলছে দেশের নারী ফুটবল। জাতীয় দলের জার্সিতে খেলার সুযোগ কম, এছাড়া নিয়মিত লিগ হয় না বলে, মেয়েদের ফুটবলে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নিয়মিত সাফল্য পাওয়ার পরও আগ্রহীর সংখ্যা কম। ছোটন মনে করেন সিনিয়র পর্যায়ে দল ভালো করলে আরও মেয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে, ‘বয়সভিত্তিক প্রায় সব পর্যায়েই আমরা অংশ নেই। এখন সিনিয়র পর্যায়ে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে মেয়ে ফুটবলারের সংকট আর থাকবে না।’
দেশের মেয়েদের ফুটবলের সফল কোচ ছোটনের তাগিদ মেনে জুনে বাফুফে ম্যাচের আয়োজন করতে পারলেই র্যাংকিংয়ের তালিকায় থাকবে লাল-সবুজ পতাকা। নইলে ২০১৮ সালের মতো বাংলাদেশের নামটি মুছে যাবে র্যাংকিং থেকে।
