সারা বিশ্ব করোনাভাইরাস মহামারীতে আতঙ্কিত। সোমবার পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে যাদের মধ্যে বেশির ভাগের বয়সই ষাটোর্ধ্ব। পৃথিবী বিগত শতাব্দীগুলোতেও বহুবার মহামারীর শিকার হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় মানুষ এর থেকে নিস্তারও পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে। উন্নত দেশগুলো তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে। কিন্তু অনুন্নত দেশগুলো এই ধরনের মহামারী মোকাবিলায় নানামুখী ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন হয়। এই ধরনের মহামারীতে অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকটের পাশাপাশি সব থেকে বেশি হয় মানসিক সংকট। তবে একথা সত্যি যে আমরা সময় থাকতে অনেক বিষয়েই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি না। কোনো একটি সমস্যা দেখা দিলে ভবিষ্যতে সেগুলো কীভাবে সমাধান করব সেসব বিষয় নিয়েও আর নতুন আলোকপাত করি না।
আমাদের বাসস্থানের চারপাশে অনেক ধরনের মাইক্রো ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়, সবসময় বিদ্যমান থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এটি ক্ষতিকর কি না? আর ক্ষতিকর হলেও কীভাবে বসবাসের জায়গায় এমন মাইক্রো ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে? বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখনকার করোনাভাইরাসের কথা। যার জন্য আজ গোটা বিশ্ব আতঙ্কিত। যে ভাইরাসের জন্য পৃথিবীব্যাপী জনজীবন থমকে গেছে, নেমে এসেছে দুর্ভোগ। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় জীবনযাপনের মান সম্পর্ক, সবকিছুতেই নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। তাই আমাদের বসবাসের পরিবেশে জীবাণুর বিস্তার প্রতিরোধে স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ-প্রকৌশলীদের কোনো কিছু করার আছে কি না সেসব বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
কারণ যখন কোনো জীবাণুর কথা আসে তখনই আমরা বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল সাবান, জীবাণুনাশক কিংবা বিশেষ কোনো ধরনের প্রতিষেধকের কথা ভাবি। এসময়ে আমাদের ভাবতে হবে আমাদের বসবাসের জায়গাগুলোকে নিয়েও। কারণ এই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের ঘরগুলো অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে সব সময়। অন্যদিকে আমরা এটাও জানি যে প্রোবায়োটিক জীবাণুগুলোর উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য সুবিধাও রয়েছে। এগুলো আমাদের পরিবেশে সর্বদাই উপস্থিত থাকে। হয়তো-বা অনেকগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ও প্রয়োজনীয় হিসেবেও পরিচিত। তবে কিছু কিছু রোগজীবাণু আছে যেগুলো বসতবাড়িতে আমাদের খুব সহজেই অসুস্থ করে তুলতে পারে। এমনকি এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই কী কী জীবাণু আমাদের বসবাসের চারপাশে থাকতে পারে সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জানা খুবই প্রয়োজন। শুধু আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নয়, পুরো সমাজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই।
এনএসএফ ইন্টারন্যাশনালের বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ-পূর্ব মিশিগানের বাইশটি পরিবারের ওপর এক সমীক্ষা চালান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা দেখতে পান যে, ‘ডিশ ওয়াশিং স্পঞ্জ’-এ সর্বাধিক পরিমাণ জীবাণু রয়েছে। তার পরে দাঁত মাজার ব্রাশ বা টুথব্রাশ হোল্ডার, রান্নাঘরের সিংক, কফি রাখার জায়গা, বিশেষ করে রান্নাঘরের কাউন্টার টপস, চুলার চারপাশ যেখানে রান্না করার সময় এটা-সেটা পড়ে থাকে, খেলনা এবং টয়লেটের আসন স্থানগুলোতে সব থেকে বেশি পরিমাণ জীবাণু বংশবিস্তার করে। তাছাড়া ময়লা রাখার জায়গাও বসতবাড়িতে সব সময় সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এসব স্থানে যেকোনো সময় জন্মগ্রহণ করতে পারে যেকোনো ধরনের জীবাণু এবং যেকোনো সময় পরিবারের মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি তা হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
অন্যদিকে বিজ্ঞানীদের একটি বড় দল যার নেতৃত্বে ছিলেন জর্দান পেসিয়া, যিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক ও পরিবেশগত প্রকৌশলের অধ্যাপক, তিনি এবং তার দল ১৯৮টি বাড়ি থেকে নমুনা পরীক্ষা করেছেন ঘরের ধুলোয় অণুজীবের বৈচিত্র্য নির্ধারণের জন্য। গবেষকরা দেখতে পান যে, সর্বাধিক সাধারণ ছত্রাকের প্রজাতি হলো লেপটোসফেরুলিনা চর্টারিয়াম, এপিকোকাম নিগ্রাম এবং ওলেলেমিয়া সেবি। সর্বাধিক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া ছিল স্ট্যাফিলোকক্কাস, স্ট্রেপ্টোকোকাস এবং কোরিনি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির। গবেষণা থেকে এটিও দেখা যায় যে পোষাপ্রাণীসহ এবং শহরতলিতে যারা বাস করেন তাদের বাড়িতে আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি ছিল।
এদিকে, কোরিয়ার সিউল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন আমাদের রেফ্রিজারেটর এবং টয়লেটে বসার স্থানগুলো নিয়ে। তারা দেখিয়েছেন যে সেখানে অধিক পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে এবং এই ব্যাকটেরিয়া অনেকগুলোই মানুষের ত্বকের সঙ্গে খুবই সম্পর্কযুক্ত এবং প্রচুর পরিমাণ জীবাণুর উৎস যা যেকোনো সময় মানুষকে বিভিন্ন ধরনের হুমকির সম্মুখীন করতে পারে।
সুতরাং আমাদের বসবাসের জায়গায়, শোবার ঘর থেকে শুরু করে ড্রইং রুম, ডাইনিং রুম, কিচেন, টুথব্রাশ হোল্ডার সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের জীবাণু যেকোনো সময় জন্মাতে পারে। কিন্তু জীবাণুর প্রভাব নির্ভর করে আমাদের বয়স আমাদের ইমিউন সিস্টেমের ওপর। কারণ মানুষে মানুষে ইমিউন সিস্টেমের পার্থক্য রয়েছে। সব ধরনের জীবাণু সব মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে না। আমাদের বসবাসের জায়গায়, আমাদের জীবনযাপনে এসব জীবাণুর সংক্রমিত হওয়ার অনেক উপায় রয়েছে। তাই স্থাপত্য নকশা বলি কিংবা যেকোনো ধরনের নকশা বলি অথবা জীবনযাপনের ধারা বলি না কেন সেখানে আমাদের সুস্পষ্টভাবে খেয়াল রাখতে হবে এই বিষয়গুলোর দিকে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাড়ির শিশুদের এবং বয়স্কদের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে আমরা করোনাভাইরাসের আতঙ্কে জর্জরিত। আমাদের মধ্যে নেমে এসেছে এক ধরনের মানসিক সংকট। অনেক ক্ষেত্রেই আতঙ্কে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এই ভাইরাস মোকাবিলার জন্য সরকার থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের সবাই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে চলছেন। যদিও দুঃখের বিষয় আমরা এখনো নিজেদের সঠিকভাবে সচেতন করে তুলতে পারিনি। যা আমাদের চলাফেরার মাধ্যমেই প্রকাশ পাচ্ছে। আর আমাদের এই ধরনের জীবনযাত্রা শুধু করোনাভাইরাস নয় ভবিষ্যতে এর থেকে আরও বিপদের সম্মুখীন করে তুলবে। তাই সমস্যা থেকেই আমাদের নতুনভাবে শুরু করতে হবে, চিন্তা করতে হবে ভবিষ্যৎ নিয়ে।
এটি প্রতীয়মান যে বর্তমানে আমাদের নির্মাণ বিধিমালায় নাগরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততার ঘাটতি রয়েছে। আমাদের মতো অধিক জনবহুল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বসবাসের জায়গার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সেই সম্পর্কে ভাবতে হবে। সরকার থেকে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমন্বয় করতে হবে দেশের চিকিৎসক, স্থপতি, প্রকৌশলী, সমাজকর্মী, বিজ্ঞানী এবং পরিকল্পনাবিদদের। প্রস্তুত করতে হবে বাংলাদেশের জন্য নতুন স্বাস্থ্যবান্ধব নগর উন্নয়ন বিধিমালা। স্থাপনা তৈরির বিধিমালাতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। আর সময় থাকতেই এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে, নইলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আর সামনে তাকানোর কিছুই থাকবে না।
লেখক : স্থপতি ও শিক্ষক, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক
