করোনাভাইরাসে ইউরোপ-আমেরিকায় মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে। বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। করোনা আতঙ্কে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এসব অঞ্চলে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না কেউই। তবে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। সরকারি নির্দেশনা মেনে কয়েক দিন মানুষ তেমন রাস্তায় বের হয়নি। এরপর গত দুদিন অনেকটা অবাধে লোকজনকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। যানবাহন চলাচলও বেড়েছে। এ নিয়ে সরকারের হাইকমান্ড চিন্তিত। যেকোনো উপায়ে জনসাধারণকে ঘরে রাখতে কঠোর হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গতকাল সোমবার বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনসাধারণ ঘরে থাকার নির্দেশনা না মানলে কঠোর হবে পুলিশ ও র্যাব। বিনা কারণে অনেকে বাসাবাড়ি থেকে বের হচ্ছে। দোকানপাটে আড্ডা দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিনা কারণে কাউকে হয়রানি বা মারধর না করতে। তাদের করোনাভাইরাস সম্পর্কে বুঝিয়ে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ বাড়াবাড়ি করলে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে নেওয়ার আগে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অবহিত করতে হবে।
বাংলাদেশে গতকাল পর্যন্ত ৪৯ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। মারা গেছেন ৫ জন। সংক্রমণ ঠেকাতে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও টহল দিচ্ছে। সরকার-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চলছে। করোনাভাইরাস আতঙ্কের সুযোগে কোনো মহল যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটাতে পারে সেজন্য পুলিশের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
গত শনি ও রবিবার বাংলাদেশে কারও শরীরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা না পড়ার খবরে রবিবারই অনেকে ঘরবাড়ি থেকে বের হন। রাস্তায় প্রাইভেট কারসহ ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করেতে দেখা যায়। গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায়-বাজারে, অলিগলিতে লোকজনের উপস্থিতি অনেক বেশি দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পরামর্শে পুলিশের নীতিনির্ধারকরা গতকাল সদর দপ্তরে অনির্ধারিত বৈঠকও করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুজব ছড়ানোর বিষয়টি সাইবার ক্রাইম বিভাগ তদন্ত করছে। যাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। শক্তভাবে তাদের দমন করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুজবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে। যারা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। গতকালের বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিনা কারণে অনেকে বাইরে বের হচ্ছেন। এতে আতঙ্কের মাত্রা বেড়ে গেছে। সরকার বারবার বলছে, সবার কথা চিন্তা করে ঘরবাড়ি থেকে যেন বের না হয়। গত দুদিন কোনো করোনা রোগী শনাক্ত না হওয়ায় আতঙ্ক কেটে গেছে মনে করছেন অনেকে। কিন্তু আসলে তা নয়। আতঙ্ক এখনো কাটেনি। প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই করোনা নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, নির্দেশ না মানলে আইনগত ব্যবস্থাসহ কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিন্তু আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। দেশের স্বার্থে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আইজিপি স্যার গত রবিবারও বলেছেন, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যাবেন না। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, জনগণের সঙ্গে পেশাদার, সহিষ্ণু ও মানবিক আচরণ করতে হবে। কাউকে অহেতুক হয়রানি করা যাবে না। সবাইকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাসাবাড়িতে চলে যেতে বলতে হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাস আতঙ্ককে কেন্দ্র করে একটি মহল ফেইসবুকে গুজব ছড়িয়ে আসছে। কিছু অনলাইনও এতে জড়িত। দীর্ঘদিন আগের ছবি আপলোড করে সাম্প্রতিক সময়ের বলে প্রচার করা হচ্ছে। মহলটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টার্গেট করে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অপপ্রচার ঠেকাতে পুলিশ সদর দপ্তর কাজ করছে। ডিএমপিসহ সবকটি মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার টিমও কাজ করছে। র্যাবও আলাদাভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে গুজবকারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানান পুলিশ ও র্যাবের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদের একজন বলেন, ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১১ সালে জ¦ালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময় নয়াপল্টনে বিএনপির অফিসের সামনে এক পিকেটারকে মারধর করা হয়। ওই মারধরের ছবিতে এক পুলিশ কর্মকর্তার মুখে মাস্ক লাগিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সময় মারধর করা হচ্ছে বলে ফেইসবুকে অপপ্রচার চালানো হয়। কলকাতা পুলিশের একটি মারধরের ছবি বাংলাদেশে নির্যাতনের কথা বলেও চালানো হয়েছে। এ দুটি ঘটনার মতো অসংখ্যা পুরনো ঘটনা বর্তমান সময়ে হচ্ছে বলে ফেইসবুকসহ অন্যান্য অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, কিছুদিন আগে তিন শতাধিক কর্মী নিয়ে একটি চক্র রাজধানী ঢাকায় গুজব ছড়াতে বিভ্রান্তিমূলক লিফলেট বিতরণ করে। লিফলেটে লেখা ছিল ‘ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক রোগ বলতে কিছু নেই। ছোঁয়াচে রোগ বিশ্বাস করা হারাম, কাট্টা কুফরি ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত’। এ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসব প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান : গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, করোনার বিস্তার রোধে ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে পুলিশের ইন্টারঅ্যাকশন বা সাক্ষাৎ হচ্ছে প্রতিদিন। এর মধ্যে গুটিকয়েক ঘটনা বা ইন্টারঅ্যাকশনের সময় পুলিশের কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে অনাকাক্সিক্ষত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়গুলো নিউজ মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনো উপায়ে পুলিশ সদর দপ্তরের দৃষ্টিতে আসামাত্রই মাঠপর্যায়ে ইউনিট কমান্ডারদের তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আইজিপি ব্যক্তিগতভাবে ভিডিও বার্তায় এবং মোবাইল ফোনে অপারেশনাল সব কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর ফলে একই ধরনের ঘটনার আর কোনো পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের দৃষ্টিতে পড়েনি। কিন্তু তারপরও কিছু নিউজ মিডিয়ায় নতুন করে পুরনো অভিযোগগুলো নিয়ে এমনভাবে নিউজ ছাপা হচ্ছে যাতে মনে হয় এখনো বলপ্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
