করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো তহবিল থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে। এই ঋণ নেওয়ার পর প্রথম ৬ মাস কিস্তি দিতে হবে না, যা গ্রেস পিরিয়ড নামে পরিচিত। ঋণ নেওয়ার দুই বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে। আর বাজেট থেকে টাকা না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। তার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের ঋণ দেবে।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণায়ে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত তহবিল গঠনের সবকিছু চূড়ান্ত করেও গতকাল সার্কুলার জারি করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। আজ মঙ্গলবার তহবিল গঠনের বিষয়ে অর্থ বিভাগ সার্কুলার জারি করবে বলে জানিয়েছেন বিভাগটির মনিটরিং সেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক-১ মো. হাকিম উদ্দিন।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, সোমবার সার্কুলারটি হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। মঙ্গলবার অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা থেকে এ সার্কুলার জারি হবে।
গত রবিবার অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, তহবিল থেকে সরাসরি শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে টাকা যাবে, মালিকদের কাছে নয়। গতকাল সোমবার এ বিষয়ে সার্কুলার জারি হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে তহবিল গঠন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বিস্তারিত তুলে ধরেন কর্মকর্তারা। তারা বলেন, তহবিলের জন্য বাজেট থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হবে। ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি শ্রমিকদের বেতন হিসাবে টাকা বিতরণ করবে।
মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকে উপস্থিতরা জানান, এটি হলে মালিকরা তহবিল থেকে অর্থ নিতে আগ্রহী হবেন না। তা ছাড়া, সরাসরি শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে তহবিলের টাকা দেওয়ার পর মালিকদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন হবে। তাই এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মালিকরা আবেদন করে ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল থেকে ঋণ নেবেন, নির্ধারিত সময় শেষে মালিকরাই তা পরিশোধ করবেন। এ ছাড়া, বাজেট থেকে তহবিলে অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত হয় সভায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয়, অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে ৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করবে। তার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করবে। ব্যাংকগুলোর কাছে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকরা এই তহবিল থেকে ঋণের জন্য আবেদন করবেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মালিকদের নামে ঋণ হিসেবে তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হবে। এই ঋণের মেয়াদ হবে ২ বছর। এর মধ্যে ৬ মাস গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। সরকার কোনো ধরনের সুদ নেবে না। যে ২ শতাংশ সুদ শিল্প মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া হবে, তা ঋণ বিতরণকারী ব্যাংক সার্ভিজ চার্জ হিসেবে নেবে।
কোন কোন রপ্তানি খাত এই সুবিধা পাবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্প এটি পাবে, তা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্য কোন কোন খাত এই তহবিল থেকে কী কাজে, কীভাবে সহায়তা পাবে, তা ঠিক করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন, শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম, অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানসহ সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে কোনো খাতে যাতে কোনো শ্রমিক বেকার না হয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিতে বলেছেন। করোনাভাইরাসের পরে যাতে প্রতিটি শিল্প খাত স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
