পোলট্রিশিল্প বাঁচানোর পথ খুঁজতে হবে

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২০, ১০:২৮ পিএম

করোনাভাইরাসের কারণে দেশে দেশে আমদানি-রপ্তানি, কল-কারখানার উৎপদান থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জনজীবন সবকিছুই থমকে পড়ায় অর্থনীতিতে এর নানামুখী প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দেশে করোনার বিস্তার এখনো সীমিত পর্যায়ে থাকলেও মার্চ মাসের শেষদিক থেকে শুরু হওয়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ছুটিতে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে গেছে। দেশব্যাপী রেলপথ, নৌপথ ও সড়ক পথের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার সব জায়গায় প্রায় জনশূন্য।  রপ্তানিমুখী শিল্পের মতোই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ধসের চিত্রও এখন স্পষ্টভাবে সামনে আসছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা পোলট্রিশিল্পে এরই মধ্যে করোনা-মন্দার প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, বাজারে চাল-ডালের মতো নানা নিত্যপণ্যের দর ক্ষেত্রবিশেষে বাড়লেও ব্যাপক হারে কমেছে ব্রয়লার মুরগি, মুরগির বাচ্চা ও ডিমের দাম। মার্চের শেষদিক থেকে পোলট্রি ও ফিশ ফিডের উৎপাদন কমে চার ভাগের এক ভাগে। আর পোলট্রিশিল্পের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বিক্রি প্রায় পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় পোলট্রিশিল্প বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। 

বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘করোনার প্রভাবে পোলট্রিশিল্পে ধস’ শিরোনামের প্রতিবেদনে পোলট্রিশিল্পে ধসের চিত্র তুলে ধরা হয়। পোলট্রিশিল্পের উদ্যোক্তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল-বিপিআইসিসি’ বলছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশীয় পোলট্রিশিল্পে গত ২০ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ দিনেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। পোলট্রি ও ফিশ ফিডের উৎপাদন ৭০-৭৫ শতাংশ কমে যাওয়া এবং পোলট্রি প্রসেসড প্রোডাক্টসের বিক্রি ৯৫ শতাংশের মতো কমে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন তারা।  বাজারে ক্রেতা না থাকায় এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম মাত্র ১ টাকায় নেমে এসেছে, যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৫ টাকা। উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারে পোলট্রি পণ্যের দরপতন ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে না পারার কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ খামারি থেকে শুরু করে উদ্যোক্তারা। এছাড়া চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত দেশের একমাত্র পিআরটিসি ল্যাবটি বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে ছাড় করানো যাচ্ছে না পোলট্রিশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল।  তাদের আশঙ্কা এ অবস্থা চলতে থাকলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে পোলট্রিশিল্প।

পোলট্রিশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ শাখা ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-বিএবি দাবি করেছে, এই কদিনেই ব্রিডার্স ও হ্যাচারি ইন্ডাস্ট্রিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৪৫৮ কোটি টাকা। একইভাবে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ-ফিআব জানিয়েছে, তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকারও অধিক। এছাড়াও বিপিআইসিসির হিসাবে বাণিজ্যিক পোলট্রিতে ডিম ও মুরগির মাংসে ৫০৩ কোটি টাকা, প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ৩১ কোটি টাকা এবং প্রাণী-ওষুধ খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে অন্তত ৮৩ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে পোলট্রিশিল্প রক্ষায় সরকারের কাছে সহায়তা চেয়ে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে বিপিআইসিসি। এগুলো হলো পোলট্রিশিল্পের বিভিন্ন শাখায় নিবন্ধিত ব্রিডার ফার্ম ও হ্যাচারি, বাণিজ্যিক মুরগির খামার, ফিড মিল, ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণের সুদ আগামী ছয় মাসের জন্য মওকুফ করা। বন্দরে আটকেপড়া কাঁচামালের কারণে জমা হতে থাকা ক্ষতিপূরণের অর্থ মওকুফ করা। সাধারণ মানুষকে দেওয়া সরকারি খাদ্য সহায়তার তালিকায় ডিম ও মুরগির মাংস বিতরণ করা।  পোলট্রির সব খাতে ৩০ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা। এবং করোনা সচেতনতার অংশ হিসেবে প্রচারমাধ্যমে ডিম, দুধ, মাছ, মাংস নিয়ে ইতিবাচক প্রচার চালানো।

দেশে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করার ক্ষেত্রে পোলট্রিশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের প্রোটিন চাহিদা পূরণে পোলট্রি খামারের মুরগি ও ডিমের কথা সর্বজনবিদিত। মনে রাখা দরকার, পুষ্টিকর ও প্রোটিন জাতীয় খাদ্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রয়োজন এবং দেশের এই শিল্প খাতের সুরক্ষার বিবেচনায় পোলট্রিশিল্প রক্ষায় সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহামারীর বিস্তার রোধে পোলট্রিশিল্পের শ্রমিক-কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার দিকেও বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে পোলট্রিপণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে বিক্রেতাদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত