বিনা কারণে ঘর থেকে বের হলেই পুলিশের বাধা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২০, ০১:০২ এএম

 গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা। বিমানবন্দর গোলচত্বর পুলিশ বক্সের সামনে যানবাহনের জটলা। কোনো কোনো গাড়ি তল্লাশি করে ছাড়ছে পুলিশ। আবার কোনোটি ফেরতও পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একই অবস্থা বনানীর পুলিশ বক্সের সামনেও। প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল থেকে লোকজন নামিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিনা কারণে যারা ঘর থেকে বের হচ্ছে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আবার কেউ ব্যাংক, হাসপাতাল, ফার্মেসিসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলে চলে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বাসাবাড়ি থেকে বের হওয়াদের সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে প্রতিনিয়ত মৃত্যু বাড়ছেই। সব জায়গায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অফিস-আদালত সবকিছুই বন্ধ। গতকাল রাস্তাঘাটে দেখা গেছে, অবাধে লোকজন চলাফেরা করছে। রাস্তায় যানবাহন চলাচলও বেড়ে গেছে। আর এসব দৃশ্য দেখে অনেকে আঁতকে উঠছে। এ নিয়ে সরকারের হাইকমান্ডের পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও চিন্তিত। সেজন্য কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্দেশ না মানলে  কঠোর হবে পুলিশ ও র‌্যাব। বিনা কারণে অনেকে বাসাবাড়ি থেকে বের হচ্ছে। দোকানপাটে আড্ডা দিচ্ছে। তবে কাউকে হয়রানি বা মারধর করা হচ্ছে না। করোনাভাইরাস সম্পর্কে বুঝিয়ে বাসায় পাঠানো হচ্ছে। কেউ বাড়াবাড়ি করলে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, দেশে ইতিমধ্যে ৫৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আর মারা গেছে ৬ জন। দিনে দিনে এর প্রভাব বাড়ছেই। গতকালও তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ-র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর গাড়ি রাস্তায় টহল দিচ্ছে। সরকার-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিশেষ নজরদারির আওতায় এনেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট-বাজার, অলিগলিতে লোকজনের উপস্থিতি কমেনি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

গতকাল ঢাকার কয়েকটি রাস্তায় সরেজমিন দেখা গেছে, অন্যদিনের মতোই অনেকে বাসাবাড়ি থেকে বের হয়েছে। প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাফেরা করছে। পুলিশকে বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে। ঢাকার বাইরেও পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নিউ মার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনে একটি প্রাইভেট কার আটক করা হয়। ওই গাড়িতে চারজন লোক বসা ছিলেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা সামনের আসনে বসা লোককে সালাম দিয়ে কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করেন। ওই সময় এক ব্যক্তি জানান, তার বাবা কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে থাকেন। তিনি অসুস্থ। এ কারণে বাসা থেকে বের হয়েছেন। ওই সময় পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেন, এ পরিস্থিতিতে যাচ্ছেন ভালো কথা। এত লোক নিয়ে তো যাওয়া ঠিক নয়। আপনি একা যান। তাছাড়া প্রাইভেট কারে বসা সবার মুখে মাস্ক ও গ্লাভসও নেই। এটা কি ঠিক হচ্ছে? একজন হলে যেতে পারেন। এ সময় ওই ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে বোঝাতে চেয়েও ব্যর্থ হন। পরে দুজনকে রেখে প্রাইভেট কার নিয়ে চলে যান। একই সময় কালো রঙের একটি প্রাইভেট কার এলে সেটিও পুলিশ আটকায়। গাড়ির মালিক নিজেকে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বলেন, ব্যাংকে যেতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হবে। এজন্য টাকা উত্তোলন করতে বাসা থেকে বের হয়েছেন। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সকাল ১০টার দিকে সিটি কলেজের সামনে একটি পাঠাও মোটরসাইকেল যাওয়ার সময় পুলিশ আটক করে। চালক নিজেকে পাঠাওচালক বলার পর পুলিশ তার লাইসেন্স দেখতে চায়। লাইসেন্স ঠিক থাকলেও পেছনের ব্যক্তিকে নিয়ে আর যেতে দেওয়া হয়নি। পাঠাওচালককে বলে দেওয়া হয়Ñ সরকারের নির্দেশমতো চলতে। করোনার পরিস্থিতি ভালো হয়ে গেলে সবার উপকার হয়। নিজে বাঁচুন। পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশকে বাঁচান।

রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর, বনানী, মগবাজার, বাংলামোটর, ধানম-ি, নিউ মার্কেট, লালবাগ এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে নানা অজুহাতে মানুষের ঘরের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও অনেককে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও রিকশাযোগে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। পুলিশও তাদের ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অধিকাংশ মানুষকেই হাসপাতাল, ব্যাংক, ফার্মেসি বা বাজারে যাচ্ছে বলে সাফাই গাইতে দেখা যায়। সন্তোষজনক জবাব না পেলে পুলিশকে গাড়ি ও মোটরসাইকেল আটকে রাখতেও দেখা গেছে।

বিমানবন্দর থানার ওসি ফরমান আলী বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই বাসাবাড়ি থেকে বের না হওয়াই ভালো। আমরা রাস্তায় সবাইকে বোঝাচ্ছি। কেউ সমস্যা পড়লে তার উপকারে যাচ্ছে পুলিশ।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ কাজ করছে। বিনা কারণে কেউ বাসাবাড়ি থেকে বের হলে তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অনর্থক কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না। ডিএমপিসহ বিভিন্ন শহরেও পুলিশ একই দায়িত্ব পালন করছে। কেউ সমস্যায় পড়লে তাকে সব ধরনের সহায়তা করতে বলা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ড. খ. মুহিদউদ্দিন বলেন, যারা বিনা কারণে রাস্তায় আসছেন তাদের বুঝিয়ে বাসায় চলে যেতে বলা হচ্ছে। করোনাভাইরাসটি তো ভালো না। এটি সবাইকে বুঝতে হবে। একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, ‘বিনা কারণে বাসাবাড়ি থেকে বের না হওয়ায়ই ভালো। পুলিশ সদস্যদের বলা হয়েছে কারোর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। করোনাভাইরাসটি সম্পর্কে বোঝাতে হবে। কেন রাস্তায় এসেছে তা আগে জানতে হবে। বিনা কারণে কেউ এলে তাকে বুঝিয়ে বাসায় ফেরত পাঠাতে হবে। কাউকে হয়রানি করা যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত