শোবিজের অন্য তারকাদের মতো গুণী শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ও ঘরবন্দি দিন কাটাচ্ছেন। সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত মুজিব জন্মশতবর্ষের একটি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে গত ১৮ মার্চ ঢাকায় ফিরে নিজের ধানম-ির বাসায় একাই থাকছেন। ঘরবিন্দ জীবন কেমন কাটছে চানতে চাইলে প্রখ্যাত এ আবৃত্তিকার ও অভিনেতা বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আবেদন কবিতার কটি লাইন মনে পড়ে গেল। “তুই থাক্ চিরদিন স্বেচ্ছাবন্দী দাস, খ্যাতিহীন কর্ম্মহীন। রাজসভা-বহিঃপ্রান্তে র’বে তোর ঘরÑ তুই মোর মালঞ্চের হ’বি মালাকর”। এ লাইনের সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির কী অদ্ভুত মিল। আমিও এখন কর্মহীন, স্বেচ্ছাবন্দি জীবনযাপন করছি। আমিও মালা গাঁথায় ব্যস্ত। তবে রবীন্দ্রনাথ ফুলের মালা গাঁথার কথা বলেছেন। আর আমি বলছি কাজের মালা গাঁথার কথা। কাজকে যদি ফুল মনে করেন, তবে তা ফুল। একাই নিজের রান্নাটা করছি, ঘর পরিষ্কার, গোছগাছ করা এসব তো আছেই। প্রতিটি কাজ যেন একটি ফুল। সেই সঙ্গে দেশ-বিদেশের খবরের চ্যানেল দেখছি, বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্বজনদের খোঁজখবর নিচ্ছি, বই পড়ছি, লেখালেখি করছি, গান শুনছি, এই তো। এ যুদ্ধে পৃথিবী জিতে গেলে আমি যে মালা গাঁথছি, তা হয়তো অনেকেই পছন্দ করবেন!’
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনা আসলেই অন্যরকম। তিনি জীবনের প্রতিটি বিষয়কে নিজের নীতিগত দিক থেকেই ভাবেন। এই যেমন কিছু বিত্তবান লোক দান করে তা যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান দিচ্ছেন, সেটা দেখে তিনি লজ্জা পান। তাই তো নিজের আত্মজীবনী লিখতে নারাজ। তার পেছনে জয়ন্তর যুক্তি আছে, ‘অনেকেই অনেক বছর ধরে আমাকে আত্মজীবনী লিখতে বলছেন। কিন্তু তাতে আমার আপত্তি আছে। আমি এমন কেউ নই যে আত্মজীবনী লিখতে হবে। তাছাড়া আত্মজীবনী নিজেও লেখা যায় না। লিখলে শতভাগ সত্যতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। লেখক নিজেকে বড় প্রমাণের এক ধরনের লোভ দেখিয়ে থাকেন। এছাড়া নিজের অন্ধকার দিকে সেভাবে আলো ফেলতে চান না। তবে কেউ যদি তার জীবন নিয়ে লিখতে চান সেটা অন্য কথা।’
জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তিনি নতুন প্রজন্মকে জানাতে চান। তাই শুরু করেছেন আত্মস্মৃতিচারণমূলক বই লেখার কাজ। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘স্মৃতিতে শিশুকালের যেখান থেকে মনে আছে সেখান থেকেই লেখা শুরু করেছি। তিন খ-ের বই হবে এটি। এর মধ্যে ৪১ এপিসোড পর্যন্ত লিখেছি। প্রতি খ-ে ৭০-৭৫টি এপিসোড থাকবে। শেষের খ-ে একটু বেশি থাকতে পারে।’ কী থাকছে বইয়ে? ‘পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য মূলত বইটি লিখছি। এখানে আমার জীবনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে পরিবার, আত্মীয়, গ্রাম, বেড়ে ওঠা, পরিচিতজন, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিম-লসহ সব। তবে এটি একটি ফিকশন বই।
তৃতীয় পুরুষের মাধ্যমে বর্ণনা এগিয়ে যাবে। সব ঘটনাই সত্য এবং অপরিবর্তিত থাকবে। তবে যে চরিত্রগুলো কিছুটা নেতিবাচক বলে মনে হবে তাদের নাম পরিবর্তন করেছি মাত্র। আমার জীবনও ত্রুটিহীন নয়। সে জীবন যেমন সংগতিপূর্ণ তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসংগতিও আছে। তেমন ঘটনাও থাকবে’ বললেন জয়ন্ত।
লেখালেখির বাইরে তিনি এখন দারুণ একটি বই পড়ছেন। কলকাতার বিখ্যাত গবেষক ড. দীপা মজুমদারের ‘ভারত শিল্পে জীবনযাপনের সামগ্রী’ বইটি মৌর্য সাম্রাজ্য থেকে শুরু হয়ে মধ্য যুগে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি এর প্রেক্ষিত বোঝার জন্য ‘মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস’ বইটিও পড়ছেন। জয়ন্ত বলেন, ‘আমি এভাবেই পড়তে পছন্দ করি। কোনো বই পড়লে তুলনামূলক আরও কয়েকটি বই পড়তে হয়। তাতে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। এর বাইরে মন ভালো করার জন্য ক্ল্যাসিকাল সংগীত শুনি। খেয়াল, ঠুমরি আর যন্ত্রসংগীত খুব প্রিয়।’
