প্রকৃত দুস্থদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে হবে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ১০:২৬ পিএম

বৈশ্বিক মহামারী নোভেল করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক অভিঘাতের প্রথম ধাক্কাটা এসেছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। দেশজুড়ে কার্যত এক ধরনের লকডাউন চলছে। অফিস-আদালত, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সবকিছু বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। গৃহকর্মী, ভিক্ষুক ও দিনমজুরদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ভোগান্তি বাড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও অনেকেই আবার কাজ ফিরে পাবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে এবং কাজ হারানো মানুষের এ সারি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য ইতিমধ্যেই কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রথম দফায় ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণার প্রাক্কালে ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রপ্তানি খাতে কর্মজীবী ও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার নগদ প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এর পাশাপাশি ভিজিডি ও ভিজিএফ কার্ড, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন। এর বাইরেও সারা দেশে শহর ও গ্রামে ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানগাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিক, রেস্তোরাঁ শ্রমিক, ফেরিওয়ালা, চায়ের দোকানদারসহ নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা তৈরি করে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব দুস্থ পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ৬৪ জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সরকারি তহবিল থেকে দরিদ্রদের মধ্যে যেন অর্থ, খাদ্য বিতরণ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়। এ কার্যক্রমে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধিরা যুক্ত থাকছেন উপদেষ্টা হিসেবে। তবু ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার খবর মিলেছে।

গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘সমন্বয়হীন ত্রাণ কার্যক্রম’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ দেওয়ার কথা বলা হলেও দেশের নানা স্থানে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা তাদের মতো করে ত্রাণ দিচ্ছে। রাজধানীতেও পরিচিত মুখগুলোই বারবার ত্রাণ পাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ত্রাণ বিতরণের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার যশোরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ত্রাণের দাবিতে ২০০ নারী-পুরুষের উপস্থিতির খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এরকম আরও নানা জায়গায় অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে।

সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের কথা বলেছে, তার সুবিধা অনানুষ্ঠানিক খাত বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পাবে না। বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতেই ৮৬ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন প্রায় ২ কোটি শ্রমিক, তারা এখন কর্মহীন। ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ায় দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে। আয়ের অভাবে তাদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেটা নিয়েও যদি অনিয়ম তৈরি হয়, তাহলে তাদের অবস্থা কতটা সঙ্গিন হবে তা সহজেই বোধগম্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনপ্রতিনিধিরা আগে যে তালিকা তৈরি করেছেন সেটা ধরে এ দুর্যোগে ত্রাণ দিলে চলবে না। কারণ তালিকায় বেশিরভাগই মুখচেনা ও দলীয়। এখন নতুন অনেক মানুষের কোনো কাজ নেই। যেমন নির্মাণশ্রমিক ও ট্রান্সপোর্ট শ্রমিকরা আগে কখনই ত্রাণ নিত না। কিন্তু এখন তাদের জন্য ত্রাণ খুবই দরকার। ত্রাণ বিতরণের জন্য সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তা হালনাগাদ করে ত্রাণ দেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের আরও তৎপর হওয়ার বিকল্প নেই। এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না, তৃণমূল পর্যায়ে অনিয়মের নেপথ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ থাকে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুঃসময়ে দুর্বৃত্তপনার শাস্তি দ্বিগুণ হওয়া উচিত। কারণ এতে কেবল দুর্গত মানুষের প্রাপ্য আত্মসাৎ করা হয় না; দুর্যোগ আরও প্রকট করে তোলা হয়। এই দুর্যোগকালে সরকারের সব কর্মসূচি যাতে প্রকৃত দুস্থদের কাছে পৌঁছায় এবং সর্বাপেক্ষা কম ত্রুটিবিচ্যুতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত