মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কারখানা কাল খুলছে

সংক্রমণ আতঙ্ক ও পরিবহন জটিলতায় পোশাক শ্রমিকরা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ০১:১৫ এএম

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এতদিন তিনি গণপরিবহনে চড়ে অফিস করেছেন। কিন্তু দেশে অঘোষিত লকডাউনের কারণে এখন তা বন্ধ। জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কার শরীরে করোনাভাইরাস আছে সেটা তো আমরা জানি না। তাই কাজ করা এখন চরম ঝুঁকি। এর মধ্যেই ৬১ জন আক্রান্ত ও ৬ জন মারা গেছে। আমি যে আক্রান্ত হব না তার গ্যারান্টি দেবে কে? আবার রাস্তায় কোনো বাস চলে না। এর মধ্যে অফিস খুলছে ৫ এপ্রিল। গাড়ি না চললে অফিস করবই বা কীভাবে? না গেলে তো আবার অনুপস্থিত করে দেবে। এ দুর্দিনে বেতন কাটা গেলে খাব কী?’

গাজীপুরের একটি টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করেন ফরিদপুরের নাঈম। তাদের কারখানা ২৫ মার্চ বন্ধ হয়ে যায়, তারপর গাজীপুর থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান তিনি। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৫ এপ্রিল রবিবার থেকে কারখানায় হাজির হতে হবে। নাঈম বলেন, ‘ফরিদপুরের ওপর সরকারের কড়াকড়ি সবচেয়ে বেশি। এখন আমি গাজীপুর যাব কীভাবে? অফিস জানিয়ে দিয়েছে, আসতে না পারলে হাজিরা কাটা হবে।’

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দেশব্যাপী কার্যত লকডাউনের মধ্যেই আগামীকাল রবিবার পোশাক কারখানাগুলো চালু হতে যাওয়ায় জাহাঙ্গীর ও নাঈমের মতো একই সংকটে পড়েছেন এ খাতের অধিকাংশ শ্রমিক। কারণ অনেক শ্রমিক এখনো গ্রামে রয়েছেন। মালিকপক্ষ রবিবার থেকে কারখানা খোলায় অনড় থাকায় শ্রমিকদের মনে প্রশ্ন, কাজে যোগ দিয়ে তাদের মধ্যে কেউ যে আক্রান্ত হবেন না সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? আর পরিবহন বন্ধ থাকলে কারখানা হাজিরই বা হবেন কীভাবে?

এমন পরিস্থিতিতে কোন প্রক্রিয়ায় কারখানা চলবে তা নির্ধারণে আজ শনিবার বিকেলে বৈঠক করবেন সাভারের আশুলিয়া অঞ্চলের পোশাক কারখানা মালিকরা। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কারখানাগুলো পরিচালিত হবে। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এরপর ২৯ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠনগুলোও সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সরকার গত ১ এপ্রিল সাধারণ ছুটির মেয়াদ ১১ তারিখ পর্যন্ত বাড়ালেও বেশিরভাগ কারখানার মালিক তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ এপ্রিল থেকেই আবারও উৎপাদনে যাওয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অনেকে ৬ তারিখ কারখানা খোলার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।

এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কারখানা মালিকদের সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। সরকার লকডাউন ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ালেও কারখানা মালিকরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল। এটা কেমন কথা? আমার শ্রমিকরা অনেকেই গ্রামে। আবার অনেকে ভয়ে আসতে চাচ্ছেন না। তাদের কী হবে? আমার দাবি থাকবে, ১১ তারিখের আগে যেসব কারখানা খুলবে তাদের যেন বাড়তি টাকা দেওয়া হয় এবং অনুপস্থিত শ্রমিকদের হাজিরা কাটা না হয়।’

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির বলেন, ‘আমার কারখানার কিছু অর্ডার আছে। এগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে। এজন্য ৫ তারিখ থেকে কারখানা চালু করব। যদিও শ্রমিকদের অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। এরপরও যে কজন পাওয়া যায় তাদের নিয়েই কাজ শুরু করা হবে। বাকিরাও হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হবে। সরকার সেই ব্যবস্থা করবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে, শ্রমিকরা সবাই যাতে সময়মতো উপস্থিত থাকার চেষ্টা করে। যারা কাছাকাছি আছে তাদের দিয়ে কার্যক্রম শুরু করব। আর সাধারণ ছুটি যদি সরকার আরও বাড়ায় তাহলে আমরা নতুন করে সিদ্ধান্ত নেব। আমরা শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করব। যাদের জ¦র-সর্দি আছে তাদের অটো ছুটি। এরপরও যদি তিন-চার দিন দেরি হয় সেটা মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু কীভাবে দূরের শ্রমিকরা কর্মস্থলে আসবে সেটা নিয়ে একটা জটিলতা থেকেই যায়। যাদের অফিসের ট্রান্সপোর্ট আছে ওইসব গাড়ি যাতে সরকার চলতে দেয় সেই বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি আমাদের অনুরোধ রইল।’

কারখানা খোলার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। তিনি বলছেন, শ্রমিকরা যেভাবে গ্রামে গেছে, সেভাবেই তাদের ফিরে আসতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার দায় বিজিএমইএ নেবে না। রুবানা বলেন, ‘আমরা কারখানা বন্ধ দিলাম লকডাউনের পর। এরপর শ্রমিকরা কীভাবে গ্রামে গেল? যারা যে প্রক্রিয়ায় বাড়িতে গেছে সেই প্রক্রিয়ায় আসবে। কাজ করবে না, আবার হাজিরাও উঠবে এটা তো হতে পারে না। দেশে আইনকানুন তো কিছু আছে। তারপরও অর্জিত ছুটি আছে, তার মাধ্যমেও সমন্বয় হতে পারে।’ শ্রমিকদের শতভাগ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কারখানাগুলো খোলা রাখতে চায়। আমাদের অনেক কারখানারই কাজ আছে। তাই অনেক কারখানা রবিবার থেকে খুলবে। তবে অনুপস্থিতির কারণে যাতে কেউ ছাঁটাই না হয় সেই বিষয়টি আমরা দেখব। শ্রমিকরাও যেন আমাদের বাস্তবতা একটু বোঝার চেষ্টা করে।’

আশুলিয়া অঞ্চলের কারখানাগুলো চলবে তা নিয়ে আজ বাংলাদেশ রপ্তানি সমিতির সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদীর নেতৃত্বে ও বিজিএমইএ সভাপতির উপস্থিতিতে মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হবে। সেখানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই দেশের সব করাখানা চলবে বলে জানিয়েছে সালাম মুর্শেদী। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো ঢাকায় আছে। এদের দিয়েই কার্যক্রম শুরু করব। আর যারা গ্রামে চলে গেছে তাদের ৯ তারিখ পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এরপরও যদি তারা অনুপস্থিত থাকে তাহলে তো আর তাদের হাজিরা উঠবে না।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘শিল্পকারখানা চালু না করলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। কিন্তু কারখানা চালুর আগে নিশ্চিত হতে হবে যে কোনো শ্রমিক করোনা আক্রান্ত নয়। বা ওই শ্রমিক কোনো বিদেশফেরত ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেনি। এছাড়া পরিবহনে ওঠার সময় হেলপার প্রত্যেক শ্রমিকের শরীরে জীবাণুনাশক স্প্রে করবে। গাড়িতেও স্প্রে করতে হবে। সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কারখানা খুলতে হবে। অন্যথায় উল্টো বিপদ বাড়বে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত