নারায়ণগঞ্জ শহরের পালপাড়ায় জ্বর-ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে এক তরুণের মৃত্যুর পর গত শুক্রবার রাতে এলাকায় প্রবেশের দুটি রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয়রা। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জ্বর ও খিঁচুনিতে ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে আরেক শিশু মারা গেছে। ওই দুই শিশুরসহ আশপাশের ৯টি পরিবারকে লকডাউনে রেখেছে উপজেলা প্রশাসন। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে জ্বর-সর্দি-শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল ভোরে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর পর বাড়ি লকডাউন ও মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এছাড়া মৌলভীবাজারের রাজনগরে জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল সকালে মারা যাওয়া এক তরুণের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ ও পরিবারকে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে প্রশাসন।
এদিকে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় গতকাল সকালে জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর পর ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। চাঁদপুরের মতলব উত্তরে জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানায় গত শুক্রবার রাতে এক নারীর মৃত্যুর পর ৫টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। এছাড়া শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে জ্বর ও মাথাব্যথা নিয়ে গতকাল সকালে মারা যাওয়া এক নারীর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার সংস্পর্শে আশা চারটি পরিবারের সাতজনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ : শহরের পালপাড়ার বাসিন্দারা জানায়, সম্প্রতি এলাকার একটি বহুতল ভবনের বাসিন্দা ওই তরুণ জ্বর-ঠাণ্ডা-শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। এ নিয়ে তিনি শহরের নয়ামাটি এলাকায় হোসিয়ারি দোকানেও যাওয়া-আসা করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে পাঠান। সেখানে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। পরে সেখানকার চিকিৎসকরা মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ ও স্বজনদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেন। এরপর স্বজনরা ওই তরুণের মরদেহ দাহ করার জন্য শহরের মাসদাইর শ্মশানে নিয়ে যান। তার জ্বর-শ্বাসকষ্টে মৃত্যুর খবর জানার পর পূজারীসহ সৎকারের সহযোগীরা পালিয়ে যান। এরপর শুক্রবার রাতে বঙ্গবন্ধু সড়কের পাশে এলাকায় প্রবেশের গেটে তালা দেওয়া হয়। এছাড়া ফকিরটোলা মসজিদের পাশের রাস্তা টিন দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ওই এলাকার বাসিন্দা ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই তরুণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন ধারণায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো পর্যন্ত আইইডিসিআর থেকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তারপরও সতর্কতার জন্য এলাকাবাসী বহিরাগতদের প্রবেশ ও অতিজরুরি প্রয়োজন ছাড়া এলাকার বাইরে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দিয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি আসদুজ্জামান বলেন, ‘পালপাড়া এলাকায় বৃহস্পতিবার এক তরুণ জ্বর-ঠাণ্ডায় মারা যাওয়ার পর এলাকাবাসী দুটি রাস্তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে বলে খবর পেয়েছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।’
লক্ষ্মীপুর : সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গাফফার বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের তোরাবগঞ্জ গ্রামে আড়াই বছরের এক শিশু মারা যায় শ্বাসকষ্ট-খিঁচুনি নিয়ে। এরপর শনিবার জ্বর নিয়ে চর মার্টিন এলাকায় মারা যায় ৫ বছরের এক শিশু। এরপর দুই শিশুর বাড়ি ও আশপাশের ৯ পরিবারকে লকডাউনে রাখা হয়েছে। তাদের মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চর মার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউছুফ আলী মিয়া জানান, ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ বছরের একটি শিশু ৩-৪ দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত ছিল। প্রথমে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতিতে শিশুটিকে নোয়াখালী হাসপাতালে নেওয়ার পথে শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়। খবর শুনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বাপ্পি মেডিকেল টিমের সঙ্গে শিশুটির বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেন এবং আশপাশের লোকজনকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানান। কমলনগর থানার ওসি মোহাম্মাদ নুরুল আবছার বলেন, ‘তোরাবগঞ্জ ও চর মার্টিনে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওই দুই বাড়ির ৯ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে।’
ঝিনাইদহ : সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, কোটচাঁদপুরের উপজেলার গার্লস স্কুল সড়কের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য এনামুল হক সুজা (৭০) দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে তিনি ফরিদপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখান থেকে ফেরার পর কয়েক দিন ধরে তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। সেই সঙ্গে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। শুক্রবার রাতে প্রতিবেশীদের কাছে খবর পেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা তার বাড়িতে গিয়ে কাশি ও বমির চিকিৎসা দেন। হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলেন। পরে শনিবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। মৃতের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
কোটচাঁদপুর থানার ওসি মাহবুবুল আলম বলেন, সকালে ওই ব্যক্তির বাড়ি ও সেখানে যাওয়ার রাস্তাটি লকডাউন করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার : রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) উর্মি রায় জানান, শনিবার সকালে মৃত্যুর পর আমাদের কাছে খবর আসে ওই তরুণের করোনার উপসর্গ ছিল। পরে আমরা তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলি। কেউ স্ট্রোক করে, আবার কেউ কেউ সর্দি-জ্বরে তার মৃত্যুর কথা জানান। আমাদের ধারণা করোনাভাইরাস নয়, তবুও যেহেতু সন্দেহ আছে তাই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফল না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারটি কোয়ারেন্টাইনে থাকবে।
নেত্রকোনা : সিভিল সার্জন ডা. মো. তাজুল ইসলাম খান জানান, খালিয়াজুরী উপজেলা সদরে গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে নৃপেন্দ্র সরকার (৫৫) মারা যান। স্থানীয়দের কাছে খবরটি জানাার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মিলি দে, রাজীব হোসেন ভূঁইয়া ও মুকুল মজুমদার মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন।
স্থানীয় সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, দুপুর ১২টার দিকে শ্মশানে গিয়ে চিকিৎসকরা মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর মৃতের পাঁচ স্বজন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু করেন।
খালিয়াজুরীর ইউএনও এ এইচ এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ব্যক্তি ৬ মাস আগে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জে আসেন। এর প্রায় এক মাস পর তিনি খালিয়াজুরীতে আসেন। তার গ্যাস্ট্রিক, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছিল। ময়মনসিংহ থেকে নমুনার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে ওই পরিবারকে বাড়িতে থাকতে বলা হয়েছে এবং তাদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে।
চাঁদপুর : সিভিল সার্জন ডা. মো. শাখাওয়াত উল্লাহ জানান, মতলব উত্তর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি গ্রামে জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানাজনিত সমস্যায় ৫৫ বছর বয়সী ওই নারী শুক্রবার রাতে মারা যান। তার মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে।
মতলব উত্তরের ইউএনও জানান, ওই নারীর মৃত্যুর পর আশপাশের ৫টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।
শরীয়তপুর : সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গতকাল সকাল ৯টায় জ্বর ও মাথাব্যথাসহ নিপা বেগমকে (৩৫) হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। ওয়ার্ডে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এরপর মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতিকালে তার স্বজনরা পালিয়ে যায়। ওই নারী সদর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা।
সদর উপজেলার ইউএনও মাহাবুর রহমান শেখ বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং পালং থানার ওসিকে নিয়ে ওই নারীর বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত ওই রোগীর সংস্পর্শে আসা ৪টি পরিবারের ৭ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।’
এদিকে নড়িয়া থানার ওসি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার ঘরিষার ইউনিয়নের থিরপাড়া গ্রামে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সন্দেহে ৩৩টি পরিবারের ১৮০ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭ পরিবারের ১৮৭ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করা হলো।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ঝিনাইদহ, নেত্রকোনা, চাঁদপুর, শরীয়তপুর প্রতিনিধি ও মৌলভীবাজার সংবাদদাতা)
