দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে গ্ল্যামারাস খেলাটার নাম- ক্রিকেট। নানা চড়াই-উতরাইয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ব দরবারে এখন আলাদা জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। লাল-সবুজের দলেও এখন তারার মেলা। তবে ক্রিকেট যেমন অনেক তারকা উপহার দিয়েছে বাংলাদেশকে, তেমনি কিছু তারার অপ্রত্যাশিত পতনও দেখেছে এ দেশের ক্রিকেট। যারা অনেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে হতেও হারিয়ে গেছেন, কেউ বা আবার অনুবাদ করতে পারেননি নিজ প্রতিভার পুরোটা। সেই সব ক্রিকেটারদের নিয়ে ধারাবাহিকে আজ থাকছে এনামুল হক জুনিয়রের গল্প-
এনামুল হক জুনিয়র নামটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে একটা জায়গায় অমর হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের নায়ক যে তিনি। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সেই টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা ছিলেন বাঁ-হাতি স্পিনার।
ম্যাচটা ২২৬ রানে জিতে বাংলাদেশ। এরপর ঢাকা টেস্ট ড্র করে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদও পায় লাল-সবুজের দল। সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেন এনামুল। ম্যাচসেরা না হলেও সিরিজ সেরার পুরস্কার হাতে ওঠে তার।
শুধু তাই নয়। ঢাকা টেস্টে ১২ উইকেট (৭+৫) নেওয়া পথে ভেঙে দেন ওয়াসিম আকরামের সবচেয়ে কম বছর বয়সে ম্যাচে ১০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড। এ ছাড়া কম বয়সে ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার পথে পেছনে ফেলে দেন ওয়াকার ইউনিস, ওয়াসিম আকরাম, ড্যানিয়েল ভেট্টরিদের।
খুব অল্পদিনে বাংলাদেশ দলে টেস্টের জন্য খুব কার্যকর বোলার হিসেবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন এনামুল। টেস্ট স্পেশালিস্ট তকমাটা তার গায়ে লেগে গিয়েছিল। টেস্টের জন্য ঠিক ক্ল্যাসিক স্পিনার বলতে যা বোঝায়- এনামুলের বোলিং ছিল ঠিক তাই।
এরপরও বাঁহাতি স্পিনারের উর্বর ভূমি বাংলাদেশে এনামুল জাতীয় দলের হয়ে নিজের জায়গাটা স্থায়ী করতে পারলেন না। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক ঘটে তার। আর ওয়ানডে অভিষেক ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। টেস্ট খেলেছেন ১৫টি। উইকেট ৪৪ টি। ইনিংস সেরা ৯৫ রানে ৭ উইকেট আর ম্যাচে সেরা- ২০০ রানে ১২ উইকেট। ১০ ওয়ানডে খেলে পেয়েছেন ১৪ উইকেট।
সর্বশেষ টেস্ট খেলেছেন ২০১৩ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই ২০০৯ সালে খেলা ওয়ানডেই হয়ে আছে তার শেষ একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
অথচ এনামুলই আবার ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে দেশের পক্ষে দ্রুততম ৩০০ ও ৪০০ উইকেটের কীর্তি গড়া বোলার। ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনো বেশ দাপটের সঙ্গেই খেলে যাচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী স্পিনার।
এনামুলের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক দর্শকেরই আক্ষেপ আছে। আছে ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদেরও। কিছুদিন আগে একটি টিভি অনুষ্ঠানে যেমন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেছিলেন, ‘ওর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যাটা আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল। ও যেভাবে শুরু করেছিল, ধারাবাহিকতা যদি আরেকটু ভালো হতো, তবে অবশ্যই ওর ক্যারিয়ার আরো ভালো হতে পারত। সেটা হলে বাংলাদেশর জন্যই ভালো হতো।’
কিন্তু কেন পারলেন না এনামুল? হাবিবুল একটা কারণের কথাও বলেছেন, ‘আমার মনে হয় এনাম (এনামুল জুনিয়র) যেখানে পিছিয়ে গেছে, ২০০৫ সালের পর আমরা ২০০৬ সালে টেস্ট ম্যাচ অনেক কম খেলেছি। ২০০৭ বিশ্বকাপের আগে প্রায় ১৪ মাস টেস্ট খেলিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের পর আর টেস্টই খেলিনি। ওই টেস্টে এনাম খুব ভালোও বল করেছিল।’
হাবিবুল বলে যান, ‘এরপর তো সাকিব আল হাসানরা চলে আসলেন। রফিক (মোহাম্মদ রফিক) তো ছিলই, আব্দুর রাজ্জাক ছিল। যারা ওয়ানডেতে বেশি কার্যকরী। তখন এনামের ওয়ানডেতে কোনো জায়গা ছিল না। কারণ টেস্ট বোলার তকমাটা ওর গায়ে লেগে গেছে। আমার মনে হয়, ওয়ানডে খেলার জন্য ও তখন ওর বোলিংটা চেঞ্জ করতে গিয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে হয়তো ওর একটু ক্ষতি হয়েছে। আমার মনে হয় এটা অনেক বড় কারণ।’
