লকডাউনেও জরুরি টেস্ট

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:৪৬ এএম

দেশে জ্যামিতিক হারে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। নতুন নতুন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। বাড়ছে ‘ক্লাস্টার’ (একই এলাকায় কম দূরত্বে একাধিক আক্রান্ত) সংখ্যাও। এমনকি আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ায় কিছু কিছু এলাকা করোনার জন্য ‘হটস্পট’ হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। লকডাউন হচ্ছে গ্রাম, পাড়া বা ভবন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে মানুষের। এমন পরিস্থিতিতে লকডাউন চলার সময়ও ব্যাপক হারে পরীক্ষা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রোগটি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যেই এক দফা সময় বাড়িয়ে আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। গতকাল সোমবার থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ওষুধের দোকান বাদে দেশের সর্বত্র সব দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ায় ঢাকায় ঢোকা-বের হওয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। সারা দেশে মানুষকে ঘরে রাখতে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি মাঠে সেনাবাহিনীও কাজ করছে। এমনকি সরকার গত চার দিন ধরে করোনা শনাক্ত পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে। এরপরও করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গত শুক্রবার থেকে আগের চেয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পর থেকেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে করোনা রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। এমনকি গত তিন দিনে দিগুণ হারে বাড়ছে আক্রান্ত।

এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারও। গতকালও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে করোনা আক্রান্ত বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি এজন্য জাতীয় কমিটির সঙ্গে অন্যান্য বিভাগের সমন্বয়হীনতাকে ইঙ্গিত করেন। অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, নতুন এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। 

এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিশেষজ্ঞরা আবারও সরকারকে করোনা শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যে হারে রোগটি ছড়াচ্ছে এবং মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে পরীক্ষা বাড়ানো ছাড়া এখন আর কোনো পথ নেই। এজন্য তারা রাজধানীর পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও পরীক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করতে বলেছেন। বিশেষ করে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া ‘সন্দেহজনকদের পরীক্ষার’ কৌশল বদলাতে বলেছেন তারা।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই যেভাবে ‘ক্লাস্টার’ এলাকা বাড়ছে, তাতে এখন আর সীমিত আকারে কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়া বলা যাবে না। কারণ গত দুই-তিন দিনে যে সামান্য পরীক্ষা বেড়েছে, তাতেই আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তার অর্থ কমিউনিটিতে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত আছেন। তাই এখন উচিত হবে পরীক্ষা আরও বাড়ানো। বিশেষ করে যারা বিদেশ থেকে এসেছেন এবং তাদের সান্নিধ্যে যারা গেছেন, সেটা আত্মীয়স্বজন বা এলাকার লোকজন হতে পারে, সবার পরীক্ষা করতে হবে। ব্যাপক হারে পরীক্ষা করা ছাড়া আমরা কিছুতেই মূল আক্রান্তদের এবং যাদের থেকে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে, তাদের শনাক্ত করতে পারব না। সেটা না হলে সংক্রমণ পরিধি আরও বাড়বে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

এমনকি ক্লাস্টার এলাকাতেও পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে না উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ক্লাস্টারের মধ্যেও রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে ওই এলাকায় যিনি আক্রান্ত বা সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন, তাকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। ক্লাস্টার এলাকায়ও পরীক্ষা বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা দেশে এখনো আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে মূল কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখানে পরীক্ষা কম হচ্ছে। সাত দিন আগেও যেখানে বাংলাদেশে মোট পরীক্ষা করা হয়েছে ১০৮৫টি, সেখানে ওইদিন ভারতে পরীক্ষা হয়েছে ২৭ হাজার ৬৮৮টি এবং পাকিস্তানে ১৪ হাজার ৩৩৬টি। ওইদিন দেশে কোনো আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ছিল না। অথচ গত দুই-তিন দিনে পরীক্ষা কিছুটা বাড়ানোর ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও লাফিয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়তে শুরু করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ বলেন, শুরু থেকেই পরীক্ষা প্রক্রিয়াকে শুধু রাজধানীর আইইডিসিআরকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সেটি সামান্য পরিমাণে বিকেন্দ্রীকরণের ফলেই এখন করোনা রোগীর তথ্য আসতে শুরু করেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত চার দিন ধরে দেশে করোনা শনাক্তে পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে সরকার। গতকালও ঢাকায় নয়টি ও ঢাকার বাইরে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৪২৪টি ও পরীক্ষা হয়েছে ৩৬২টি। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১২৬টি ও পরীক্ষা হয়েছে ১০৬টি। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ হাজার ৬১০টি।

সরকারের পরীক্ষার এই চিত্র ‘সন্তোষজনক’ নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সরকারি হিসেবেই বিভিন্ন বিমানবন্দর, স্থল ও সমুদ্রবন্দর এবং ট্রেন স্টেশনে বিদেশ থেকে আসা ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৬ জনের স্ক্রিনিং করেছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৬১০ জনের। এমনকি এই বিপুলসংখ্যক বিদেশফেরতের মধ্যে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া গেছে মাত্র ৬৬ হাজার ৮১০ জনকে। তার মানে এখনো অসংখ্য বিদেশফেরত পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইনের বাইরে। এদের মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে সক্ষমতা সত্ত্বেও এখনো দেশের সব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সরকারের কয়েকটি ল্যাবরেটরির বিশেষজ্ঞ। তারা জানান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ১৪টি কেন্দ্রে দিনে চার হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সেখানে গতকালও পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৪৬৮টি। অর্থাৎ করোনা রোগের পরীক্ষাকেন্দ্রের (ল্যাবরেটরি) সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়েনি। কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ১০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ ও সরবরাহ বাড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রথম থেকেই রোগের পরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গত শুক্রবারও সংস্থাটির প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, রোগী শনাক্ত করা, পরীক্ষা করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। এ ছাড়া তিনি তথ্য সংগ্রহ করা এবং যোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা রোগের পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। পরিস্থিতি বোঝার জন্য সারা দেশে নমুনা সংগ্রহের বিস্তার ঘটানো হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে রোগী বাড়ছে। তাই আমরা আরও বেশি নমুনা সংগ্রহ করব। এপ্রিলের মধ্যেই মোট ২৮টি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা শুরু হবে।

শুরু থেকেই করোনার পরীক্ষা করে আসছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গত দুই মাসে একাধিকবার সাংবাদিকদের বলেছেন, দিনে এক হাজার নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা তার প্রতিষ্ঠানের আছে। কিন্তু গতকালও তার প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৩৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

ল্যাবরেটরিগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে পরীক্ষা বাড়ানোর পক্ষে জেলার সিভিল সার্জন ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. অনুপম বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫টি নমুনা সংগ্রহ করেছি এবং পরীক্ষা করেছি ১০টি। অথচ আমাদের ল্যাবরেটরিতে আমরা এক দিনে একবারে ৯৪টি নমুনা পরীক্ষা করতে পারি।

তাহলে এত কম করছেন কেন জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করি না। একটি পাঁচ সদস্যের টিম আছে। তারা সদর হাসপাতালে গিয়ে সেখানে আসা সন্দেহজনক রোগীদের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। তাদের মধ্যে যাদের সন্দেহ বেশি হয় তাদের নমুনা সংগ্রহ করে। বাকিদের চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। মেডিকেল কলেজে কেউ সরাসরি এলে পরীক্ষা করাতে পারবেন না। নমুনা সংগ্রহের জন্য ওই টিমকে দেখাতে হবে।

তবে এই বিশেষজ্ঞ মত দেন, উপজেলা লেভেলে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। অনেকে ভয়ে নমুনা দিতে আসে না। তাদের খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা অনেকেই পরীক্ষার বাইরে থেকে যাবে ও রোগের সংক্রমণ ছড়াবে। তা ছাড়া জেলা পর্যায়েও পরীক্ষা বাড়াতে হবে।

এদিকে বিভিন্ন দেশ করোনা পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েই সে দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং অনেক দেশে নিয়ন্ত্রণে আনতে পরীক্ষা বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও হংকংয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে কেবল বেশি পরীক্ষার কারণেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ১.৬ মিলিয়ন তথা ১৬ লাখ মানুষের পরীক্ষা করেছে। দিনে এক লাখ টেস্টের চেষ্টা করছে যুক্তরাজ্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত