করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের পাশাপাশি নিজেদের পাড়া-মহল্লা-গ্রাম স্বেচ্ছায় লকডাউন করেছেন স্থানীয়রা। এরমধ্যে গতকাল মঙ্গলবার টাঙ্গাইল জেলা ও রূপগঞ্জকে লকডাউন করেছে প্রশাসন। এছাড়া দিনাজপুর ও কুমিল্লার দাউদকান্দির প্রায় ১৮৯ পরিবার স্বেচ্ছায় লকডাউনে রয়েছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার প্রায় ৫৩ বাড়ি নিজ উদ্যোগে লকডাউন করেছেন স্থানীয়রা। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের ১৭ গ্রাম লকডাউনে রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও নারায়ণগঞ্জে সোনারগাঁয়ে কয়েকটি পাড়া স্বেচ্ছায় লকডাউন করেছে স্খানীয়রা। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
জেলা উপজেলা : করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে টাঙ্গাইল জেলা লকডাউন ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জেলার সার্কিট হাউজে পুলিশ বিভাগ, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ আদেশ জারি থাকবে বলেও টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় রূপগঞ্জ উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
দুই স্থানে ১৮৯ পরিবার লকডাউন : দিনাজপুর শহরের এক পাড়ার ১৭০টি পরিবার স্বেচ্ছায় লকডাউনে রয়েছেন। গতকাল শহরের সুইহারী আশ্রমপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুটি ব্যানার টাঙিয়ে ৩টি প্রবেশপথের মধ্যে ২টি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এলাকাটির বাসিন্দা চিরঞ্জিত সরকার জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আমরা এই লকডাউনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে তিনটি বাড়ি লকডাউন করেছে উপজেলা প্রশাসন। গত সোমবার রাত ১২টায় গৌরীপুর পশ্চিম বাজারে রকিব ভূইয়ার দুই ইউনিটের তিন তলা এবং মোস্তাক মিয়ার চারতলা ভবনসহ পাশের টিনসেড ভবনের ১৯টি পরিবারকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল আলম সুমন বলেন, চারতলা ভবনের ভাড়াটিয়া তিতাস উপজেলার শাহপুর গ্রামেরআলী আহম্মদের ছেলে রাব্বি আহম্মেদ (২২) তিনদিন আগে ঠা-া, জ¦র নিয়ে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
৫৩ বাড়ি লকডাউন : চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এক ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকায় তার বাড়িসহ তিনটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। গতকাল আইইডিসিআর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের একজন শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিলে এই লকডাউন করা হয়। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পর মঙ্গলবার দুপুরে সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের তিনটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় নিজ উদ্যোগে নিজেদের অর্ধশতাধিক বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছেন স্থানীয়রা। এসব বাড়িতে সাইনবোর্ড ও লাল পতাকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এলাকায় অবাধে মানুষ চলফেরা করলেও স্থানীয় প্রশাসন লকডাউন ঘোষণা না করায় এলাকাবসী নিজেরাই লকডাউন করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো এলাকা লকডাউন করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তারা এটা নিজেদের উদ্যোগে করেছেন। এ বিষয়টি আমাদের এখনো তারা জানাননি।
দুই স্থানে ১৭ গ্রাম লকডাইন : করোনা মোকাবিলায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার পৃথক ৬টি গ্রাম স্বেচ্ছা লকডাউন করেছেন স্থানীয়রা। গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলার নয়াকান্দি, ভিটিকান্দি, বালুয়াকান্দি, বাউশিয়া, রসুলপুর ও লক্ষèীপুরা গ্রামের বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় গ্রাম লকডাউন করেছেন। এসব গ্রামে প্রবেশপথের সড়ক বাঁশ ও গাছের গুঁড়ি ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান সাদী বলেন, স্বেচ্ছায় গ্রামে গ্রামে লকডাউন করার খবর আমি জানতে পেরেছি। করোনা মোকাবিলায় গ্রামবাসী নিজেদের সুরক্ষায় নিজেরাই পুরো গ্রাম লকডাউন করে দিচ্ছে। এটা তারা নিজেদের স্বেচ্ছায় করছেনÑ এটা ভালো দিকই বলব আমি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের প্রবেশপথ বন্ধ করে স্বেচ্ছায় লকডাউন করেছেন গ্রামবাসী। গ্রামগুলো হচ্ছে উপজেলার শমশেরনগর ইউপির শিংরাউলী, মাধবপুর ইউপির মাঝেরগাঁও, শিমুলতলা, আদমপুর ইউপির হোমেরজান, তেতইগাঁও, ঘোড়ামারা, সদর ইউপির পশ্চিম কান্দিগাঁও, বনগাঁও, আলীনগর ইউপির উত্তর তিলকপুর, কামদপুর, গকুলনগর গ্রাম। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক জানান, কমলগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম স্বেচ্ছায় লকডাউনে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পৌর সদরের শক্তিপুর গ্রাম সোমবার বিকাল থেকে স্বেচ্ছায় ‘লকডাউন’ করে দিয়েছেন এলাকাবাসী। এ গ্রামের দুপাশের প্রবেশপথে বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে ‘বাহিরের লোক প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের কোর্টপাড়া এলাকার একাংশ বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে জনবিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। তবে ওই এলাকার কেউ করোনা শনাক্ত হয়নি।
পাড়া মহল্লা : চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় একাধিক পাড়াকে স্বেচ্ছায় লকডাউন করেছেন এলাকাবাসী। গত সোমবার বিকেলে ও মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব এলাকার বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে লকডাউনের ঘোষণা দেন। আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা স্বউদ্যোগে এ কাজটি করেছেন। তবে প্রশাসনের এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার যেহেতু চাচ্ছে ঘর থেকে লোকজন বের না হওয়ার। সে উদ্দেশে সেটি করে থাকলে ভালোই হয়েছে। তবে লোকজনের যাতে ক্ষতি না হয়।
নারায়ণগঞ্জে সোনারগঁাঁয়ে এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগেই লকডাউন করার নামে বন্ধ করে দিচ্ছেন পাড়া-মহল্লার রাস্তা। উপজেলার একটি পৌরসভা ও দশটি ইউনিয়নের অনেক গ্রামই এখন এ ধরনের লকডাউনের আওতায়। স্থানীয়রা এলাকার চলাচলের রাস্তায় গাছের গুঁড়ি, বাঁশ ও কাঠের বেড়া দিয়ে জনগণের চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছেন।
এ ব্যাপারে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, সোনারগাঁ উপজেলাকে প্রশাসনিক ভাবে এখনো লকডাউন করা হয়নি। সোনারগাঁয়ের বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয়রা মানুষের চলাচলের রাস্তা বেড়া দিয়ে বন্ধ করছেন।
