করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবীমার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে কর্তব্য পালনকারী চিকিৎসক ও নার্সদের পুরস্কৃত করার এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও ইঙ্গিত দেন তিনি।
চলতি মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস বড় ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সরকারপ্রধান। দেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এই ভাইরাসটির প্রসারিত হওয়ার বিষয়টি অঙ্কের মতো। এপ্রিলে আমাদের দেশে এর ধাক্কা ব্যাপকভাবে আসবে। এ রকমই আলামত পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের কিছু প্রতিবেদনও আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই অবস্থায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
গতকাল মঙ্গলবার সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভবন থেকে অনুষ্ঠিত এই ভিডিও কনফারেন্স বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে। দুই বিভাগের ১৫টি জেলার জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা এতে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস। মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। গণভবন প্রান্তে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কভিড-১৯ মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনীর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ প্রজাতন্ত্রের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বিশেষ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা করে দেব।’ তিনি বলেন, ‘পদমর্যাদা অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার হবে এই ইন্স্যুরেন্স। পাশাপাশি কর্তব্য পালনকালে কেউ কভিট-১৯ আক্রান্ত হলে তার সার্বিক চিকিৎসা সরকার নিশ্চিত করবে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউ মৃত্যুবরণ করলে এই ইন্স্যুরেন্সটি ৫ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য সচিবের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই করোনার বিরুদ্ধে আমরা যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি সেই যুদ্ধের সম্মুখভাগে থেকেই আপনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই এটি আপনাদের পুরস্কার।’
তিনি বলেন, ‘যারা করোনার শুরুর সময় সেই জানুয়ারি থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিশেষ করে মার্চ মাসে দায়িত্ব পালন করেছেন কেবল তাদের জন্যই এই এই বীমা সুবিধা থাকবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে এই করোনা আমরা মোকাবিলা করেছি বলেই পরিস্থিতি আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি এবং অন্যান্য দেশের মতো এটি এত ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হতে পারেনি। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি এপ্রিল মাসটিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করে দেশবাসী এবং প্রশাসনকে সতর্ক করেন এবং খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায় খাদ্য পৌঁছে দেওয়াসহ সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি ও হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা সাহসী স্বাস্থ্যকর্মী তাদের উৎসাহ দেওয়াটা প্রয়োজন এবং এজন্য একটা বিশেষ সম্মানীও আমি দিতে চাই। সেজন্য আমি তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছি এবং তালিকা করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘যে সমস্ত চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী কভিট-১৯ সংক্রমণের শুরু থেকেই চিকিৎসাসেবা প্রদানে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন তাদের পুরস্কার প্রদান করতে হলে তালিকাটা আমার দরকার।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর করোনা আক্রান্ত হওয়া এবং এই ঘটনায় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পাওয়া সংক্রান্ত মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি সংবাদে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং যেসব হাসপাতালে গিয়ে সে চিকিৎসাসেবা পায়নি তাতে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা কাজ করেনি এবং নিজেদের সুরক্ষা করার জন্য পালিয়ে গেছে এবং যেখানে রোগীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরে চিকিৎসা পায়নি, অন্য সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হয়েছে, তাদের জন্য এই সম্মানী বা প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না। বরং ভবিষ্যতে তারা ডাক্তারি করতে পারবে কি না সেটাই চিন্তা করতে হবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই রোগী যেখানে যেখানে গিয়েছে (চিকিৎসার জন্য) সেখানে কোন কোন ডাক্তার দায়িত্বে ছিল তাদের নামটা আমি জানতে চাই। তাদের ডাক্তারি বা চাকরি করার সক্ষমতা নেই। তাদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়াটা উচিত বলে আমি মনে করি।’
ডাক্তারদের সুরক্ষায় তার সরকারের উদ্যোগসমূহ তুলে ধরে বলেন, ‘অ্যাপ্রন পরে চিকিৎসা করুন। আপনাদের সুরক্ষায় তো আমরা কোনো কার্পণ্য করছি না এবং ভবিষ্যতেও করব না। চিকিৎসক হিসেবে আপনাদের তো দায় রয়েছে।’ একজন রোগী কেন চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে মারা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী কেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে মারা গেলÑপ্রশ্ন তোলেন তিনি।
শেখ হাসিনা এ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্তারোপকারীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘যাদের মধ্যে এতটুকু মানবতাবোধ নেই তাদের শর্তারোপ করে কোনো কাজ করার দরকার নেই। আল্লাহ না করুন দেশের তেমন খারাপ অবস্থা হয়ে গেলে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ডাক্তার, নার্স এনে চিকিৎসা করাতে হবে। কারণ, এই ধরনের দুর্বল মানসিকতা দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’
তিনি বলেন, সেই সঙ্গে আমি আমাদের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মচারী যারা কভিড-১৯ ব্যাপক সংক্রমণ রোধে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেনÑ আমি আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এপ্রিল মাসটা সতর্ক থাকতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আর রোগ লুকানো যাবে না। কোনো সমস্যা মনে করলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এতে লজ্জার কিছু নেই। বরং রোগ লুকিয়ে রাখলে আপনি আরও দশজনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারেন।’ কেউ আক্রান্ত হলে সে অচ্ছুত হয়ে গেছে এমন মানসিকতা পরিহার করার আহ্বান জানান তিনি। করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে হলে সবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে সতর্কবাণী দিয়েছি এই সতর্কতা মেনে চলবেন। তাহলে অনেক জীবন রক্ষা পাবে।’
এ সময় খেটে খাওয়া দিনমজুর শ্রেণির মানুষের কাজের অভাবে খাদ্যাভাবের আশঙ্কা ব্যক্ত করে তাদের দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব জেলার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা সংকোচে বা লজ্জায় ত্রাণ চাইতে পারেন না তাদের প্রতি আপনারা খেয়াল রাখবেন।’ তিনি এ সময় মুজিববর্ষে সকল গৃহহীনকে একটি টিনের হলেও ঘর করে দেওয়ার তার সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ভিজিডি, ভিজিএফসহ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে যেসব খেটে খাওয়া লোকজন রয়েছেন তাদের সাহায্যের জন্য একটি তালিকা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট মহলকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি সবাইকে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও নির্দেশনা প্রদান করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষের দুর্ভোগের সময় ত্রাণ নিয়ে কেউ নয়-ছয় করবেন না। তাহলে কিন্তু রক্ষা পাবেন না।’ তিনি বলেন, ‘নয়-ছয় করলে আপনাকে ধরা পড়তেই হবে। টাকা-পয়সা কিন্তু লুকানো যায় না। দুঃসময়ে কেউ দুর্নীতি করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে, তাকে কিন্তু আমি ছাড়ব না।’
প্রধানমন্ত্রী বাজারে পণ্য সরবরাহ সঠিক রাখার এবং দ্রব্যমূল্য মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতেও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি তার নির্দেশনা পুনর্ব্যক্ত করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সাপ্লাইটা ঠিক রাখতে হবে। মানে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেন মানুষ চাহিদামতো পায়। সেই দিকটা একটু খেয়াল রাখতে হবে। ওইটা বন্ধ করলে চলবে না। সরবরাহটা ঠিক রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের কোথাও এতটুকু জমি ফেলে না রেখে ফসল উৎপাদন এবং বাড়ির পাশের এক চিলতে জায়গাটিতেও ফলমূল, সবজি ও তরিতরকারি, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুর খামার বা ঘরের পাশের জলাটি ফেলে না রেখে সেখানে মৎস্য খামার গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রী আসন্ন শবেবরাতের রাতে ঘরে বসে ইবাদত-বন্দেগি করার আহ্বান জানান এবং বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ ঘরে অবস্থান করেই উদযাপনে সরকারের নির্দেশ সবাইকে মেনে চলতে বলেন।
তিনি বলেন, ‘মসজিদে ভিড় না করে শবেবরাতের নামাজ যেন ঘরে আদায় করা হয়। আল্লাহকে ডাকলে যেকোনো স্থান থেকে ডাকা যায়। শবেবরাতের রাতে সবাই দোয়া করবেন, যেন আমরা করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাই।’
চট্টগ্রাম জেলার সঙ্গে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে উপস্থিত চট্টগ্রামের মেয়র আজম নাসিরকে উদ্দেশ করে মশার উপদ্রব রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণে সারা দেশের সিটি এবং পৌর মেয়রদের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ভারত থেকে দেশে অনুপ্রবেশ বন্ধে কড়াকড়ি আরোপে বিজিবিকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এই সময়ে কেউ দেশে ঢুকতে পারবে না। ’
