দেশে করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকার তালিকায় এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার পর রয়েছে শিল্প ও বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জ। প্রতিদিনই এখানে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসেবে নারায়ণগঞ্জে গতকাল বুধবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে ৬ জনের। আর মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ জন। করোনা সংμমণের ‘রেড জোন’ ঘোষিত নারায়ণগঞ্জ জেলাকে লকডাউন করার পর এই ভাইরাসে সংক্রামিত রোগী শনাক্তে ল্যাব স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে। ইতিমধ্যে জেলার বিভিনড়ব স্তরের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিনড়ব শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। ফেইসবুকসহ বিভিনড়ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ‘করোনার ডেঞ্জার জোন’ নারায়ণগঞ্জে টেস্ট ল্যাব স্থাপনের জোর দাবি উঠেছে।
তবে শিগগিরই নারায়ণগঞ্জে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে করোনা পরীক্ষার ল্যাব করার সক্ষমতা আমাদের নেই। এজন্য যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক প্রয়োজন তা না থাকায় আইইডিসিআরের টিম নারায়ণগঞ্জে এসে নমুনা পরীক্ষা করে নিয়ে যাচ্ছে। পরে টেস্ট রিপোর্ট প্রদান করছে।’
কিন্তু সিভিল সার্জনের ওই যুক্তি মানতে নারাজ নারায়ণগঞ্জবাসী। তারা বলছেন, প্রয়োজনে বাইরে থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক এনে এই ল্যাব চালু করা জরুরি। নইলে নারায়ণগঞ্জে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জে গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে প্রাণ গেছে ৬ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ জন। দেশে সর্বপ্রম চিহ্নিত ৩ করোনা রোগীর মধ্যে ২ জনই ছিলেন নারায়ণগঞ্জের। গত ৩০ মার্চ বন্দরের রসুলবাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রম মারা যান এক নারী। এরপর থেকে মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে প্রতিদিনই। ঘনবসতি ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে গুরুত্ব বিবেচনায় শুরু থেকেই করোনাভাইরাস সংক্রামিত রোগী শনাক্তের পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছে নারায়ণগঞ্জের বিভিণ্ণ শ্রেণি-পেশার মানুষ। কিন্তু জেলায় নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা হলেও করোনা শনাক্তের পরীক্ষাগার করার ব্যাপারে এখনো সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার করোনার ভয়াবহতা রোধে পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। এরপর গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় সর্বোচ্চ কড়াকড়ি। এরই মধ্যে গতকাল ভোরে শহরের জামতলা এলাকায় আফতাব উদ্দিন (৭০) নামে এক ব্যক্তি করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। নমুনা সংগ্রহের পর স্থানীয় কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খোরশেদের নেতৃত্বে মাসদাইর কবরস্থানে জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার আরও তিনজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ বিভিনড়ব জেলায় গিয়ে সেখানে করোনা আক্রান্ত রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। করোনা শনাক্তে বিলম্বের কারণে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে মত নগরবাসীর। তাদের ভাষ্য, করোনা পরীক্ষার জন্য ডেঞ্জার জোন নারায়ণগঞ্জে ল্যাব (পরীক্ষাগার) স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কবি হালিম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে একটি করোনা পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন খুবই জরুরি। ইতিমধ্যে যারা করোনায় মারা গেছেন, দাফনের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তারা করোনায় মারা গেছেন। তাই ল্যাব থাকলে আরও দ্রুত করোনা রোগী চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’
বন্দর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবির সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও মেয়রের এলাকা। দেশের সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স পে হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক দিয়ে শীর্ষে থাকা নারায়ণগঞ্জ আজ গভীর সংকটে। করোনায় ঢাকার পরের অবস্থান নারায়ণগঞ্জের। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ল্যাব স্থাপন করা না গেলে মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ইতিমধ্যে লকডাউন করে নারায়ণগঞ্জকে অর্ধেকটা বাঁচিয়েছে। আর বাকি অর্ধেকটা বাঁচতে পারে করোনার পরীক্ষাগার (ল্যাব) স্থাপন করে। কেননা পরীক্ষার অভাবেই এখানে দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস।’
এর আগে গত ৬ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদনে দ্রুত নারায়ণগঞ্জে করোনা টেস্ট ল্যাব স্থাপনের দাবি জানান।
