স্কুলের শিক্ষার্থীরা কী করছে এই সময়? প্রতিদিন ক্লাসের দৌড় নেই, গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া নেই, নেই ক্লাসের পরীক্ষার চাপ। কি ‘এখন কি খুেদ শিক্ষার্থীরা শুধু খাবে আর ঘমুাবে? মানষু তো আসলে অলসভাবে বসে থাকতে পারে না, থাকতে চায় না। সে কিছু না কিছু করতে চায়। নিশ্চয়ই ওদেরও কিছু একটা করা দরকার। ‘সংসদ টিভি’-তে এখন কিছু কাস পচ্রারিত হচ্ছে, হয়তো সেসব বিদ্যালয়ের ক্লাসের সঙ্গে হুবহু মিলবে না; তারপরও সেগুলো দেখা যেতে পারে, অনেকটাই কাজে লাগবে। এতদিন তো শুধু শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কা¬স করেছে, এবার একটু অন্য স্যারদের কাস দেখকু এটিও এক ধরনের শিক্ষা। এতদিন যা-ই পড়েছে তার অধিকাংশই কিংবা পুেরাটাই ছিল পরীক্ষাসংশিষ্ট। পরীক্ষায় যা আসবে তাই পড়ব, যা আসার সম্ভাবনা নেই তা আর ছঁয়ে দেখব না, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার একটা সুেযাগ করে দিয়েছে এই করোনা মহামারীর কাল।
পড়ার ও জানার যে অপার আনন্দ তা ফিকে করে দেয়, মাটি করে দেয় এই পরীক্ষার পড়ার চিন্তা। কাজেই এখন সেই সময় ফিরে এসেছে, মনের আনন্দে পড়ার। এই সময় শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইগুলো পড়ে ফেলতে পারে। অর্থাৎ মলূ বইগুলো বারবার করে পড়ার পর দেখার মধ্যে অন্য এক ধরনের শক্তি সঞ্চিত হয়, অন্য এক ধরনের চোখ খুেল যায়। পরিবেশের কারণে অনেকেই পাঠ্যবই পড়ার সুেযাগ ও সময় পায় না। অনেকেই নিভর্র করে বাজারের নোট, গাইড, শিক্ষকের দেওয়া নোটের ওপর। এতে শিক্ষার্থীদের যে নিজসব শক্তি আছে তা ব্যবহার করার, রয়াগ করার সময় ও সুেযাগ তারা পায় না। এই ব্যাপারটি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সজৃনক্ষমতাকে ভোঁতা করে দেয়।
এই সময় তারা শুধইু কি কাসের বই পড়বে? না। বাসায় বিভিন œলেখকের যে বইগুলো আছে সেসব তারা পড়ে ফেলতে পারে। বাসায় বাবা, চাচা, বড় ভাই, বড় বোনদের কাছ থেকে নিয়ে সেসব বই পড়ে ফেলতে পারে ওরা। এই পড়া অন্য এক ধরনের চোখ খুেল দেবে। জানার দিগন্ত পস্রারিত করে দেবে। বিভিণ্ণ চ্যানেলে শিক্ষামলূক বিভিণ্ণ ধরনের অনষ্ঠুান হয়, সেগুলোও দেখতে পারে। ইংরেজি উচ্চারণ ও লিসেনিং স্কিল বাড়ানোর জন্য বিবিসি ও সিএনএনের মতো নিউজ চ্যানেলগুলোর অনষ্ঠুান শুনতে পারে মাঝেমধ্যে। নিউজের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও স্থানের ছবি দেখানো হয়, করোনার খবর দেখায় বিস্তারিতভাবে। ছবি দেখা ও ইংরেজি শোনা বিষয় দুেটা শিক্ষার্থীদের দারুণ কাজে লাগবে। ভালো কোনো মুিভ দেখতে পারে। বাসায়, বারান্দায়, বাসার সামনে একটু আধটু হাঁটাহাঁটি করতে পারে। যেসব বিষয় দেখছে, চিন্তা করছে সেগুলোর ওপর বাংলা ও ইংরেজিতে কিছু কিছু লিখে ফেলার চেষ্টা করতে পারে। তাতে শিক্ষার্থীদের লেখার ক্ষমতা বাড়বে, সজৃনশীলতা প্রকাশ পাবে, পরীক্ষার জন্য সবকিছ মুখুস্থ করার অভ্যাসটিও কমে যাবে। মনে আনন্দ পাবে। এভাবে তাদের দীঘর্ গহৃবন্দিতের¡ সময়টাও কেটে যাবে।
শিক্ষকদেরও কিন্তু ‘পেশাগত উনয়ণ্ণের জন্য অনেক কিছু করার আছে এই সময়ে। পেশাগত উনয়নের জন্য ফিডব্যাক দেওয়া ও ফিডব্যাক নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একজন সহকর্মী অন্য সহকর্মীদের সামনে একটি ক্লাস উপস্থাপন করবেন তার ভলু-ত্রুটিগুলো জানার জন্য, কারণ নিজে নিজেকে পুেরাপুির বিচার করা যায় না। একজন শিক্ষকের ক্লাস কিন্তু ‘অনেকের জন্য, অনেক শিক্ষার্থীর জন্য। তাই সেখানে পারফেকশন আনতে হলে বারবার ফিডব্যাক নিতে হয়, উপস্থাপন করতে হয় নিজের আত্মবিশ্বাস ও তাতে বেড়ে যায়। এ কাজটি শিক্ষকজীবনের একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ হলেও আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে এর চর্চা নেই, দুচারটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়া। এখন সংসদ টিভিতে যে ক্লাসগুলো উপাস্থাপন করা হচ্ছে, শিক্ষকগণও কিন্তু ‘সেগুলো দেখতে পারেন, সেখানে কে কতটা ভালো করেছেন আপনি সেগুলো অনসুরণ করতে পারেন। কার কোথায় ত্রুটি রয়ে গেছে আপনি সে জায়গাগুলো সংশোধন করে নিজের ক্লাস ভালোভাবে নিতে পারবেন। শিক্ষাসংক্রান্ত বহু ওয়েবসাইট আছে, সেগুলো ব্রাউজ করতে পারেন। পড়তে পারেন অনেক শিক্ষামলূক আটির্কেলস। ইউটিউবে অনেক ক্লাস দেখা যায়, সেগুলো দেখতে পারেন। বাসায় যেসব বই রেখে দিয়েছিলেন তাকে সাজিয়ে, সময়ের অভাবে পড়া হয়নি সেগুলো পড়ে ফেলতে পারেন। এগুলো সবই ব্যক্তিগত উনয়ন ও পেশাগত উনয়ণ্ণের জন্য জরুরি।
করোনাকালে নিজেকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য য সংস্থা থেকে যেসব নিদের্শাবলি দেওয়া হয়েছে সেগুলো মোবাইলে শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জানাতে পারেন। এটিও শিক্ষাদানের এবং সামাজিক দায়িতের¡ অংশ। করোনার উপসগর্গুলো কী কী সেগুলো জানাতে পারেন। কারও করোনার উপসগর্ দেখা দিলে ৩৩৩ নম্বরে বা ৯৯৯ বা ১৬২৬৩নম্বরে ফোন দিতে বলতে পারেন। পাশের বাড়িতে বিদেশ থেকে কেউ এলে ১৪ দিন আলাদা থাকার কথা, কেন থাকতে হবে সেগুলোর কথার বলতে পারেন আপনার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের।
তবে সংবাদপত্রে একটি সংবাদ দেখে খারাপ লেগেছে। সেটি হচ্ছে করোনার কারণে আটকে গেছে সাড়ে চার লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কমর্চারীর এমপিওর টাকা। সরকারি ছুিট ও নানা জটিলতার কারণে আটকে আছে তাদের এই অথর্। শিক্ষকদের বাড়িভাড়া দিতে হয়, বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়, সংসার চালাতে হয়, আনষুঙ্গিক খরচ বহন করতে হয়। তাদের ঘরে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস না থাকে, বাজার না থাকে, তাহলে তিনি কীভাবে মনোযোগ দেবেন নিজের পেশাগত উনয়ণ্ণের দিকে, শিক্ষার্থীদের উনয়ন্ননের দিকে এবং সর্বোপরি সমাজ ও দেশের উন্নয়নের দিকে। তাই সংশিষ্ট কতর্পৃক্ষকে বিনীত অনুেরাধ করছি এমপিওভক্তু শিক্ষকদের অথের্র ছাড় করে জরুরি ভিত্তিতে যাতে তাদের নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে চলে যায় সেই ব্যবস্থা করার। শিক্ষকদের অথর্নৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে ফেলে দিয়ে আমরা কি ‘আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। বিষয়টি দবাভাবিক সময়ে যেমন প্রয়োজন, এই দুর্যাগপণূর্ মুহূর্তের তা আরও বেশি প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষক, ব্রাক শিক্ষা কমর্সূিচ
