ভোটার না হলে মিলছে না ত্রাণ!

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২০, ০৪:৫৭ এএম

নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার ঘোষিত ছুটিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে রাজধানীর হাজার হাজার দিনমজুর। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। দুবেলার খাবার নিশ্চিত করতে সব বাধা উপেক্ষা করে নেমে এসেছে রাস্তায়। সাহায্যের আশায় ফাঁকা রাস্তার ফুটপাতে কেউ বসে আছেন, কেউ দিশেহারার মতো এদিক ওদিকে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তারা যে এলাকায় থাকেন সেখানকার ভোটার না বলে পাননি সরকারি কোনো সহায়তা।

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজার, মুগদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পল্টন, প্রেস ক্লাব, লালবাগ, আজিমপুর, নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ফাঁকা সড়কের ফুটপাতে যেখানেই একটু ছায়া আছে সেখানেই খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন অসহায় মানুষ।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ হোটেলে ধোয়ামোছার কাজ করতেন। কেউ আবার চায়ের দোকান চালাতেন। কারও ছিল ফুটপাতে ছোট্ট কাপড়ের দোকান। তাদের কেউ কেউ ১০ থেকে ১২ দিন আগে কিছু চাল-ডাল সহায়তা পেলেও এখন আর সহায়তা পাচ্ছেন না। তাদের কাছে থাকা সঞ্চিত টাকাও শেষ হয়ে যাওয়ায় নেমে এসেছেন রাস্তায়।

কয়েকটি স্থানে দেখা গেছে টিসিবির খাদ্যপণ্য বিক্রির সময় ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন। সেখানে নারী-পুরুষের অনেকেই মুখ ঢেকে খাদ্য ক্রয়ের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। জীবনের প্রম রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে চাল, ডাল, তেল কিনছেন।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কার্জন হলের সামনে ফুটপাতে বসে থাকতে দেখা যায় ফরিদা বেগম (৫০) নামে এক নারীকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, আনন্দবাজার এলাকায় ওসমান মোল্লার বাসার একটি রুমে ভাড়া থাকেন। তার ছোট দুই সন্তান রয়েছে। ঢাবির শহীদুল্লাহ হলের ক্যান্টিনে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করতেন। প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের পাশাপাশি ২০০ টাকা পেতেন। এই টাকাতেই চলত তার সংসার। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খালি হয়ে গেছে হল। বন্ধ হয়ে গেছে ক্যান্টিনও। গত ১৯ মার্চ থেকে কাজ নেই তার। এই কদিন কোনো মতে চলতে পারলেও এখন আর পারছেন না। খুব ভোরে এসে বসে আছেন, যদি কেউ খাবার দেয় সে আশায়। রাজধানীর পল্টন এলাকায় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অপু পাল নামে এক ব্যক্তিকে। একটি সিএনজি নিয়ে এ প্রতিবেদক ওই ব্যক্তির কাছে থামলে তিনি এগিয়ে আসেন। জানান, সামান্য সাহায্যের আশায়ই রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছেন।

অপু পাল জানান, আজিমপুর এতিমখানা মোড়ে তার বাসা। লালবাগে রাস্তার পাশে টং দোকান ছিল তার। গত ৮ বছর ধরে সেখানেই চায়ের দোকানদারি করে সংসার চালান। করোনার জন্য গত ২২ মার্চ থেকে তার দোকান বন্ধ। লালবাগ শহীদ নগরের কাউন্সিলরের কাছে সাহায্যের জন্য গেলেও পাননি। লালবাগ থানায় গিয়েও কোনো সহায়তা পাননি। তিনি যে এলাকায় থাকেন সেই এলাকার ভোটার না হওয়াতেই সমস্যায় পড়েছেন। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ফুটপাতে অপেক্ষায় থেকেও কারও কোনো সাহায্য পাননি। গতকাল রাত সাড়ে ৭টার দিকে ওই ব্যক্তির মুঠোফোনে কল করলে তিনি জানান, শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটপাতে ঘুরলেও কোনো সহায়তা পাননি। তিন বছরের এক মেয়ে, আট বছরের এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে তার। এ বিষয়ে লালবাগ থানার ওসি কেএম আশরাফ উদ্দীন বলেন, থানা থেকে যে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তা আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে। আমাদের কাছে যারাই সহায়তার জন্য আসছেন আমরা তাদের স্থানীয় কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলছি। তবে ভোটার না হলে কাউন্সিলররা সহায়তা দিচ্ছেন না এমন কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। তিনি জানান, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার কারণে কয়েক দিন ধরে বিভিনড়ব বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির উদ্যোগে সড়কের পাশে খাবার দেওয়ার পরিমাণ কমেছে।

আজিমপুর এলাকায় ফুটপাতে সাহায্যের আশায় বসে থাকতে দেখা যায় জাহানারা বেগম নামে এক নারীকে। তিনি জানান, ফুটপাতে খাবারের দোকান ছিল তার। করোনার ফলে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ১০ থেকে ১৫ দিন আগে হাইকোর্টের সামনে সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়া ৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি করে তেল, ডাল ও লবণ এবং একটি সাবান পেয়েছেন। সেগুলো শেষ হওয়ার পর আর কোনো সহায়তা পাননি। ফলে সহায়তার জন্য রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন। এদিকে করোনার এই ধাক্কায় বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্তরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির সামনের সড়কে টিসিবির খাদ্য বিক্রির গাড়ির পেছনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। অন্তত দুইশ মানুষ সেখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারও কাপড়ের দোকান ছিল, কারও ছিল খাবারের হোটেল। কেউ কেউ আবার বেসরকারি বিভিনড়ব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, গত মাসের বেতনও পাননি। ফলে স্বল্প মূল্যের চাল, ডাল, তেল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত