লোকশিল্পীদের সুরক্ষায় মানবিক পদক্ষেপ প্রয়োজন

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০১:০৮ এএম

প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ তার চরিত্রগুণেই বাংলার পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা লোকগান, লোকনৃত্য, লোকনাট্য; বস্তগত লোকশিল্পের বিচিত্র ভান্ডার শখের হাঁড়ি, মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, শোলার পাখি, সামুদ্রিক শঙ্খ, বাঁশ-বেতের কুলা-ডালা, নকশিকাঁথা, তালপাতার হাতপাখা, কাঁসা-পিতলের সামগ্রী; খাদ্যসংস্কৃতির অমৃত প্রকাশ মন্ডা-মিঠাই, জিলাপি, খই-মুড়কি, বাতাসা-কদমা, ছাচখাজার নকশি বাহার, পিঠা-পুলির সুগন্ধি স্বাদ সর্বস্তরের মানুষের সামনে তুলে আনে। গ্রামের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে যা নিজের অন্দরমহলে চর্চা করে। বাংলা নববর্ষ এলে সেই চর্চা স্বরূপে অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে আসে প্রকাশ্যে এবং আদায় করে ছাড়ে জনমানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি শহরে অনুপ্রবেশের খুব একটা সুযোগ পায় না। একমাত্র বাংলা নববর্ষ এলেই ঐতিহ্যগতভাবে চর্চিত গ্রামীণ সংস্কৃতির শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম শহরে এনে প্রদর্শন ও বিক্রি করার সুযোগ পায়। এটার ভিত্তিতে গ্রামীণ লোকশিল্পীরা তাদের শিল্পচর্চার যেমন একটা মানসিক উদ্দীপনা পায় তেমনি শহরের মানুষের কাছে তাদের শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সারা বছর বেঁচে থাকার মতো উপার্জনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আয় করে থাকে।

আসলে, বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় যে লোকশিল্পের কোনো প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি, এমনকি গ্রামের শিক্ষিতরাও যে লোকশিল্পকে অবহেলার চোখে দেখে এবং সেই অবহেলার কারণে গ্রামীণ জনপদ থেকে লোকমেলার চরিত্র ও চর্চাও লুপ্তপ্রায়; সেখানে বাংলা নববর্ষ উদযাপন কেন্দ্রিক শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত মেলায় নিজেদের শিল্পকর্ম ও প্রদর্শন বিক্রির সুযোগ লোকশিল্পীদের চাতক পাখির বৃষ্টির জলপানের মতো আনন্দসম। তারা সারা বছর ধরে নিজেদের শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন বাংলা নববর্ষে শহরের মেলায় প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য। এ বছরও তারা সেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। ঘরে ঘরে জমা করেছেন পোড়ামাটির শখের হাঁড়ি, মাটির পুতুল, সরাচিত্র, কাঠের মমিপুতুল, কাঠের বর্ণিল হাতি-ঘোড়া, কাঁসা-পিতলের গহনা ও তৈজসপত্র, শোলা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ময়ূরপঙ্খী নাও, শোলার ময়না-টিয়ে দিয়ে সাজিয়েছেন খাঁচা, রঙিন চিত্র আঁকা পাখা ও শীতল পাটি বুনে রেখেছেন, নকশিকাঁথায় সুইসুতা দিয়ে নতুন গল্প বুনেছেন! কিন্তু এবার এই শিল্পীদের কেউ শহরে বা গ্রামের কোনো বৈশাখীমেলায় অংশ নিতে পারবেন না। অবশ্য, এর কারণটা আজকে সবার জানা।

কিন্তু জানা নেই, এই শিল্পীদের কী অবস্থা হবে? কেমন করে কাটাবেন তারা আগামী দিনগুলো? বা প্রায় এক মাস ঘরবন্দি থেকে তারা আসলে কীভাবে বেঁচে আছেন? কেউ কি তাদের খোঁজ রেখেছেন? এই প্রশ্নগুলোই বারবার উঁকি দিচ্ছে এবারের পহেলা বৈশাখে, এবারের নববর্ষে। কারণ, আমরা প্রতি বছর মুগ্ধ হয়ে তাদের শিল্পকর্ম দেখে আত্মার প্রশান্তি পেয়ে এসেছি আমাদের দেশের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লুপ্ত হয়ে যায়নি বলে। বাংলার ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষ হিসেবে আমরা আনন্দিত হয়ে এসেছি এই ভেবে যে, এদেশের লোকশিল্পীরা এখনো লোকশিল্পের চর্চা ও সাধনায় নিয়োজিত আছেন।

ঢাকার নাগরিক পরিমন্ডলে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উদযাপনে পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় সর্বস্তরের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের সম্মেলন ঘটে। এরমধ্যে রমনার বটমূলের ছায়ানট আয়োজিত নববর্ষের

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূলত নাগরিক পরিমন্ডলে চর্চিত রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকসংগীত ও নৃত্যের উপস্থাপনা শহরবাসীকে যেমন মুগ্ধ করে তেমনি অনুষ্ঠানটি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারের মাধ্যমে সারা দেশবাসীকেও আনন্দ দিয়ে থাকে। এমনকি রমনায় ছায়ানটের বাংলা নববর্ষের উদ্যাপনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে কৃষিজীবী গ্রামীণ মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি পান্তা ভাত খাওয়াকে শহরবাসী দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পহেলা বৈশাখ মঙ্গল শোভাযাত্রার গুরুত্ব আলাদা রকমের। এতে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষর্থীদের সৃষ্ট শিল্পকর্ম নিয়ে চারুকলা অনুষদ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে থাকে, যার সম্মুখভাগে লোকজ ঢাক-ঢোল বাদ্যের সমাহার থাকে, সেই সঙ্গে একথাও উল্লেখ্য চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যে সব মুখোশ, জীব-জন্তু, পশু-পাখি, পুতুল ও বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী-ভাস্কর্য নির্মাণ করে থাকেন তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিল্প অনুসৃত। এছাড়া, লোকজ চিত্রকলার অনুসরণে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে প্রতি বছর চারুকলা অনুষদের প্রাচীরে লোকজ চিত্রকলার ধারায় দেয়ালচিত্র অংকন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আয়োজন হলেও তাতে ঢাকা শহরের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে। আর এই বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এরইমধ্যে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। 

ঢাকা মহানগরের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য শুধু পহেলা বৈশাখ দিনটির মধ্যে সীমায়িত থাকে না। বরং পহেলা বৈশাখ থেকে তা শুরু করে দশ-পনের দিনের বৈশাখীমেলায় রূপ গ্রহণ করে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতি বছরের বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কেন্দ্র আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী বৈশাখীমেলায়। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদে বৈশাখী লোকমেলা বসে। এ সব বৈশাখীমেলাতে বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে আগত বিভিন্ন ধরনের বস্তুগত লোকশিল্পের শিল্পী-বিক্রেতারা যেমন অংশগ্রহণ করে থাকেন তেমনি পরিবেশনশিল্পের শিল্পীরা নানাবিধ শিল্প পরিবেশন করেন। পাশাপাশি এসময় কিছু ভ্রাম্যমাণ লোকশিল্পী এই শহর-বন্দরগুলোতে বৈশাখীমেলাকে ঘিরে তাদের শিল্প প্রদর্শন ও বিক্রি করে থাকেন।

বাংলাদেশের কিছু বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্পের শিল্পীরা তাদের শিল্পচর্চার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন বাংলা নববর্ষ কেন্দ্রিক এই বৈশাখীমেলাকে আশ্রয় করে। যেমন বাংলাদেশের রাজশাহী-নাটোর-চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্প শখের হাঁড়ি। আদিতে গ্রামাঞ্চলের মানুষ রান্না-বান্নার কাজে মাটির হাঁড়ি এবং গৃহস্থের অন্যান্য কাজে মাটির পাত্র ব্যবহার করতেন, এমনকি বিবাহ অনুষ্ঠান নতুন আত্মীয় বাড়িতে মিষ্টান্ন পাঠাতে শখের হাঁড়ি তথা নানা রঙের চিত্রে সজ্জিত রঙিন হাঁড়ি ব্যবহার করতেন। বাংলাদেশের মৃৎশিল্পী পাল বা কুমাররা এই মাটির হাঁড়ি ও শখের হাঁড়ি তৈরি করতেন। যুগের পরিবর্তনে বাংলাদেশে মৃৎপাত্রের ব্যবহার বিলুপ্তপ্রায়, সেই সঙ্গে যুগের আধুনিকতায় বিবাহের আয়োজনে শখের হাঁড়ির ব্যবহার আর নেই বললেই চলে। কিন্তু এই শখের হাঁড়ির অংকিত শিল্পকর্ম বাংলাদেশের নানন্দিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষরবাহী। বহু বছর ধরে নগরকেন্দ্রিক বৈশাখীমেলায় চিত্রে রঙিন শখের হাঁড়ির শিল্পী রাজশাহীর সুশান্ত কুমার পাল এবং তার সন্তানেরা অংশ নিয়ে থাকেন এবং তারা বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় শখের হাঁড়ির ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমির পর্যবেক্ষক দল রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘুরে শখের হাঁড়ি ঐতিহ্যের বর্তমান চর্চা বিষয়ে অনুসন্ধানে গিয়ে এই শিল্পের বিলুপ্তপ্রায় ধারা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে সুশান্ত কুমার পাল এবং তার সন্তানরা ছাড়া আর কাউকে এই শিল্পচর্চার সঙ্গে নিবিষ্ট দেখা যায়নি। এবছরও তিনি বৈশাখীমেলার জন্য শখের হাঁড়ির ভান্ডার জমিয়েছিলেন কয়েক মাস ধরে। কিন্তু এবার বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের বিস্তারে মানুষকে আত্মরক্ষায় গৃহবন্দি থাকতে হচ্ছে, তাই হবে না বাংলা নববর্ষের বৈশাখীমেলা! এই পরিস্থিতিতে সুশান্ত কুমার পালের মতো লোকশিল্পীরা কী করবেন? সবার মতো তিনিও আত্মরক্ষার জন্য গৃহবন্দি, তার সঙ্গে গৃহবন্দি তার এবারের সৃষ্টিকর্ম!

আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রতিটি দরিদ্র লোকশিল্পীর উপার্জন শুধু লোকশিল্পকর্ম নির্ভর, তারা যদি তা বিক্রি না করতে পারেন তবে তারা কী খেয়ে জীবন বাঁচাবেন। সেই সঙ্গে আমাদের এ কথাও জানা আছে, লোকশিল্পীরা দরিদ্র হতে পারেন কিন্তু সাহায্যের জন্য হাত পাততে পারেন না, বরং না খেয়ে মরবেন, এটাই তাদের আত্মসম্মান। এ পরিস্থিতিতে এই করোনা কালের বাংলা নববর্ষ উদযাপনে কে হবেন তাদের সহায়। বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবার হচ্ছে না বলে আমরা যেন বাংলাদেশের লোকশিল্পীদের রক্ষার কথা না ভুলে যাই।

এই লেখাতে মাত্র একজন শিল্পীর দৃষ্টান্ত দিয়েছি। আরও আছেন শত শত শিল্পী, দুর্যোগকালে আমরা তাদের রক্ষার উদ্যোগ নিলে নিশ্চয় এই কালো মেঘ কেটে গেলে আবার তারা আমাদের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্ণিল রূপ মেলে ধরবেন আমাদের সম্মুখে। সেই বর্ণিল উদ্ভাসে অনিবার্যভাবে আবার রাঙা হয়ে উঠবে নতুন বছর।

লেখক

লেখক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত