চিকিৎসকদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২০, ১১:১৮ পিএম

 জানা ইতিহাসে পৃথিবীর সব মহাদেশে, বেশিরভাগ দেশ ও অঞ্চলে আর কোনো মহামারীর এমন সংক্রমণ একই সঙ্গে ঘটেনি; যেমনটা এখন ঘটছে করোনাভাইরাসে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পরিসংখ্যান অনুসারে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় দুই শত দেশে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর করোনাভাইরাস থেকে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে সব দেশ মিলিয়ে এ সময় পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৭ জন। করোনার সর্বব্যাপী সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেননি। জাপান ও কিউবাসহ কয়েকটি দেশ করোনার চিকিৎসায় ওষুধ তৈরি করলেও সেসব যেমন এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয় তেমনি সব দেশের জন্য সহজলভ্যও নয়। এই মহামারী চিকিৎসাসেবায় মানুষের এমন অসহায়ত্বের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য খাত আর স্বাস্থ্যসেবার ভয়াবহ দেউলিয়াত্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে। শিল্পোনড়বত পশ্চিমা দেশগুলোও এর বাইরে নয়। তবুও আশার কথা এই যে, দেশে দেশে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে মানবজাতির এই মহাদুর্যোগে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

খুবই সংক্রমণ এই ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উনড়বত হাসপাতালগুলোতেও শত শত স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন। করোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত থেকে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইতালিতে এরই মধ্যে একশোরও বেশি চিকিৎসক মারা গেছেন। একইভাবে বিভিনড়ব দেশে মারা যাচ্ছেন বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী। করোনায় আক্রান্ত এক চিকিৎসকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বুধবার বাংলাদেশের চিকিৎসকরাও সম্মুখযোদ্ধাদের মৃত্যুর এই তালিকায় যুক্ত হলেন। বুধবার ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারী এই চিকিৎসকের নাম মঈন উদ্দিন। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে। ৪৭ বছর বয়সী মঈন সিলেট নগরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। মঈনের শরীরে গত ৫ এপ্রিল করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি শুরুতে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। ৭ এপ্রিল শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৮ এপ্রিল তাকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু মঈনকে বাঁচানো যায়নি। এদিকে তার চিকিৎসায় যে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া গেছে সেটি খুবই দুঃখজনক। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চিকিৎসক মঈন উদ্দিনের পরিবারের সব দায়িত্ব সরকার বহন করবে।

করোনাযুদ্ধে চিকিৎসক মঈন উদ্দিনের মৃত্যু দেশের জন্য এক সতর্ক সংকেত। এটা লক্ষ করবার মতো বিষয় যে, দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ হওয়ার দিনই আমরা একজন চিকিৎসককে হারালাম। ভয়ের ব্যাপার হলো দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত করোনা রোগীর ১০ ভাগই স্বাস্থ্যকর্মী। করোনায় উপদ্রুত অনেক উনড়বত দেশও তাদের স্বাস্থ্যসেবার সবটা কাজে লাগিয়েও এখনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। মনে রাখা দরকার বাংলাদেশ এমনিতেই চিকিৎসক ঘাটতির দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী জনসংখ্যার চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে চিকিৎসক ঘাটতি প্রায় ৭০ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে করোনা মোকাবিলায় চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে সরকারকে। অবশ্য সরকার বলে আসছে, করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিতদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক বা পিপিই থেকে শুরু করে অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জামের কোনো অভাব এখন নেই। কিন্তু শুধু পিপিই বা আনুষঙ্গিক সুরক্ষাই সব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনার দুর্যোগ মোকাবিলায় সামনে থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সব চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীকে পরিচালিত করার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। প্রয়োজন পুরো সক্ষমতাকে যুদ্ধকালীন সেনাদলের মতো কয়েক সারিতে ভাগ করে সেভাবে তাদের পরিচালিত করা। যাতে কোনোভাবেই পুরো সেনাদল আক্রান্ত হয়ে না পড়ে।

আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করাসহ তাদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। করোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও অন্যদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য রাজধানীর ১৯টি হোটেলে ৫৮০টি কক্ষ বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি না ফিরে ওই হোটেলগুলোতে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন তারা। চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ তাদের পরিবারগুলোর নিরাপত্তার কথা ভেবে এ চিন্তা করেছে সরকার। একই সঙ্গে সবাইকে চাঙ্গা রাখার জন্য তাদের যথাযথ আহার-বিশ্রাম এবং আনুষঙ্গিক সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মনে রাখা প্রয়োজন, গত বছর দেশে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত ৮ জন চিকিৎসক ও ২৯ জন নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসা সেবার মহান ব্রত গ্রহণ করে যারা এই পেশায় এসেছেন তাদের অবদানকে গুরুত্বের সঙ্গে সমাজে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে এই মহাদুর্যোগে তারাই সম্মুখযোদ্ধা। তাদের অনিরাপদ রেখে এ যুদ্ধে জেতা যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত