করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসকের মৃত্যু

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২০, ০৩:৩১ এএম

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মঈন উদ্দিন (৫০) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হলেও এই প্রম কোনো চিকিৎসকের মৃত্যু হলো। করোনা শনাক্ত হওয়ার ১০ দিনের মাথায় গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, দু-তিন দিন আগে ডা. মঈনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এ জন্য তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। বুধবার ভোর সাড়ে ৪টায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার এই মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডা. মঈন উদ্দিনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘এই মহান চিকিৎসক তার নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেও জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। দেশ ও জাতি তার এই আত্মত্যাগ চিরকাল স্মরণ করবে।’ ডা. মঈনের স্ত্রী ডা. রিফাত জাহান চৌধুরী সিলেটের বেসরকারি পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত। এই দম্পতির দুটি সন্তান রয়েছে। ডা. মঈন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামের পল্লীচিকিৎসক মুন্সী আহমদ উদ্দিনের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে সন্তান। মঈন উদ্দিন ছাতকের ধারণ নতুন বাজার উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস, এফসিপিএস ও এমডি সম্পনড়ব করেন। বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। মাঠপর্যায়ে বিভিনড়ব পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১১ সালে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি তিনি সিলেটের বেসরকারি ইবনে সিনা হাসপাতালেও তার প্রাইভেট চেম্বার ছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতেই ডা. মঈন সিলেটে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ টিমের সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে করোনার উপসর্গ দেখা দিলে গত ৩০ মার্চ থেকে নগরীর হাউজিং এস্টেটের বাসায় তিনি কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। এরপর নমুনা পরীক্ষা শেষে ৫ এপ্রিল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে জানানো হয়, ডা. মঈন উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত। পরে দুদিন বাসায়ই তার চিকিৎসা চলে। পাশাপাশি হাউজিং এস্টেট এলাকাকে লকডাউন করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ৭ এপ্রিল ড. মঈনকে নগরীর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করা হয়। পরদিন তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। গত সোমবার থেকে সেখানে তিনি লাইফসাপোর্টে ছিলেন। গতকাল ভোরে তার মৃত্যু হয়।

ডা. মঈন উদ্দিন সিলেটে জনপ্রিয় চিকিৎসক ছিলেন। তার ব্যবহারে রোগীরা মুগ্ধ হতেন। তার মৃত্যুতে সিলেটে চিকিৎসকসহ সব মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার খুরমা উত্তর ইউনিয়নের নাদামপুর গ্রামে জানাজা শেষে মঈনকে দাফন করা হয় বলে জানিয়েছেন ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. গোলাম কবির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই চিকিৎসকের পরিবারের পক্ষ থেকে

লাশ দাফনের কথা জানানোর পরই সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ ঢাকা থেকে প্রমে সিলেটে এবং পরে তার গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সদস্যদের উপস্থিতিতে জানাজা শেষ তাকে দাফন করা হয়।

শোক : ডা. মঈন উদ্দিনের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি ডা. এম এ মুবিন খান ও সাধারণ সম্পাদক ডা. এনামুর রহমান, এমপি ও খুলনা মেডিকেল কলেজসহ চিকিৎসকদের বিভিনড়ব সংগঠন শোক জানিয়েছে।

শুμবার গ্রামের বাড়িতে ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিতেন ডা. মঈন : ডা. মঈন উদ্দিন তার গ্রামের বাড়ি ছাতকের নাদামপুরে প্রতি শুক্রবার এলাকার দুস্থ রোগীদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিতেন। এ ছাড়া তার চেম্বারেও কেউ অসহায়ত্বের কথা জানালে বিনা ফিতেই তিনি তাকে দেখতেন। তার এলাকার হোমিও চিকিৎসক আছকির মিয়া বলেন, ‘মঈন স্যার ছিলেন গরিবের ডাক্তার। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে তিনি আন্তরিক সেবা দিতেন। তার ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ হতেন। অসহায় লোকজনকে তিনি বিনা টাকায় ওষুধও দিতেন। তার এই মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অনেকেই কানড়বাকাটি করছেন।’

গ্রামের বাসিন্দা গিরিধর দাস বলেন, ‘ডা. মঈন উদ্দিন মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই তার মৃত্যুতে মানুষ এখন কাঁদছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত