সমগ্র মানবজাতি এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। এই কঠিন সময়ের কাজ হলো আশা ভরসা নিয়ে মহান প্রভু আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করা। মানুষকে আশার বাণী শোনানো, তাদের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কঠিন সময়েও হতাশ না হওয়া।
নিষ্ঠুর ও কঠিন সময়ের একের পর এক চিত্র এখন আমাদের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে। ফরিদপুরের মধুখালীতে এক ব্যক্তি রাস্তার পাশে সারা দিন পড়েছিলেন। সারা দিন রাস্তায় তিনি কাতরাতে থাকেন, তার সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। প্রশাসনের লোকেরা যতক্ষণে এসে তাকে হাসপাতালে নিতে গেলেন, ততক্ষণে তিনি মারা যান। অন্য স্থানে এক আত্মীয়কে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন একজন। ডাক্তার তার করোনা সন্দেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলে আত্মীয়কে ফেলে পালিয়ে যান ওই ব্যক্তি। ঘনিষ্ঠদের এমন নিষ্ঠুর আচরণের অসংখ্য খবর এখন চারদিকে।
সন্তান বাবার লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, করোনার রোগী ভেবে মাকে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কারণে বাড়ির মালিক চিকিৎসককে বাড়ি ছাড়তে নোটিস দিচ্ছেন। করোনায় মৃত বলে লাশ বহন করার খাটিয়া পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। করোনায় আক্রান্তদের কবরস্থানে মাটি না দেওয়ার জন্যও মানববন্ধন হয়েছে। বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এই সন্দেহে আমাদেরই আশপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা করতে এসেছে এমন অসুস্থ রোগীকে সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ করে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। ভাবখানা এমন, আমরা নিজেরা পূত-পবিত্র; করোনা যাদের ধরছে তারা অভিশপ্ত! অথবা তারা কোনোদিন কোনো রোগে ভুগবে না, এ নিশ্চয়তা তাদের দেওয়া হয়েছে! হঠাৎ করেই যেন সবকিছু বদলে গেল। আমরা ভিন্ন মানুষ হয়ে গেলাম। করোনাতঙ্ক আমাদের অমানুষ বানিয়ে দিল। অনেকের মাঝে এখন করোনাতঙ্কের চেয়ে সামাজিক নিষ্ঠুরতা নিয়ে বেশি ভয় কাজ করছে।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষ হিসেবে কি আমাদের আচরণ এমন হওয়ার কথা ছিল? বিপদে মানুষ কেন এত অস্থির হবে, ধৈর্যহারা হবে? হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী শিক্ষা দিয়েছেন আমাদের? শিক্ষা, মানবিকতা সব ভুলে গেছি আমরা। অথচ অসুস্থ ব্যক্তির সেবা-যত্ন করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া ও সান্ত্বনার বাণী শোনানো মহানবীর (সা.) সুন্নত।
ইসলাম সুস্থ ব্যক্তির কল্যাণ কামনার পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের প্রতিও দয়াশীল। নবী করিম (সা.) যখনই কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন, তখন তিনি তার জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করতেন এবং তাকে সুসংবাদ দিতেন। রোগীর সেবাযত্ন করাকে সর্বোৎকৃষ্ট নেক আমল ও ইবাদত ঘোষণা করেছেন আল্লাহর রাসুল (সা.)।
হাদিসে বলা হয়েছে, ক্ষুধার্তকে খাবার দানের কথা, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার কথা এবং কোনো মানুষ দুঃখ-কষ্টে থাকলে তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু করোনাতঙ্ক আমাদের সব ভুলিয়ে দিয়েছে। সেবা তো দূরে থাক, উল্টো কেউ অসুস্থ হলে আমরা তাকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলছি, বেঁচে থাকার ন্যূনতম আশাটুকু কেড়ে নিচ্ছি। বলা হয় সংকটে মানুষের মূল চরিত্র প্রকাশিত হয়। করোনার মতো ভয়াবহ বিপদ মানুষের সামনে আসায় মানুষকে নতুন করে চেনা যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে রক্ত, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো এখন যাচাই হয়ে যাচ্ছে। আগুনের মতো কঠিন দহনের কষ্ট ছাড়াই মানুষ অন্যের প্রতি ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করছে।
আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মনোভাব এই যে, মানুষের কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্র আন্তরিক নয়। কিন্তু আমরা নিজেরা কি নিজেদের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি বা পারছি? মনে রাখতে হবে, বিপদ সবার। বিপদ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া, নেতাকর্মী, আলেম-উলামা, জজ-ব্যারিস্টার, ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী পক্ষ কাউকে আলাদা করে চেনে না। সুতরাং সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে এ বিপদ মোকাবিলা করতে হবে। পরস্পরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে।
কোরআন মানুষের দুটি ভুলকে তুলনামূলকভাবে উল্লেখ করে থাকে। সেটা হলো- যখন অবস্থা ভালো থাকে তখন অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করা আর যখন অভাব-অনটন কিংবা কোনো সমস্যায় পড়ে তখন আশাহত হয়ে পড়া। উভয় আচরণকে কোরআনে ভুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের এই আচরণ কিংবা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোরআনের অনেক স্থানে সমালোচনা করা হয়েছে। করোনাকালে যেন আমরা এসব ভুলে না যাই।
ইসলামে মানবতার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তার আমল করার এক উত্তম সুযোগ এই করোনাকালে আল্লাহতায়ালা আমাদের দিয়েছেন। আমাদের উচিত করোনায় আক্রান্তদের সেবা করা, গরিব-দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো, কেউ মারা গেলে তার দাফনের কাজে সহযোগিতা করা এবং মানুষকে পরোপকারে উৎসাহিত করা। রোগীর সেবা ও মৃতের দাফনে এগিয়ে আসার ইসলামের শিক্ষা যেন আমরা কাজে প্রমাণ করতে পারি।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
