এই পৃথিবীর দাসদের জন্য ‘ধর্ম’ সেদিন মানবতার নয়- অন্য। ‘দর্শন’ বক্র। প্লেটো অ্যারিস্টটলের মতো জ্ঞানীরা ছলনাময়। প্লেটো বলতেন, ‘ন্যাচারাল স্লেভ’। দাসরা নাকি দাস হয়েই জন্মেছে গ্রিসের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। ‘যে মানুষ তাড়াতাড়ি হাঁটে সে সভ্য নয়’। প্রাচীন গ্রিসে দাসেদের ক্ষেত্রে সভ্যতার সংজ্ঞা ছিল অন্য। অ্যারিস্টটল বলতেন ‘এনিমেটেড টুলস’ দাসদের ছেড়ে দিলে সভ্যতার বেগতি। সুতরাং, হে ক্রীতদাস ক্রীতদাসী তোমরা প্রকৃতিকে অমান্য কোরো না, তোমরা লালসামুক্ত থাকো শ্রম দাও, জীবন দাও। কান্না কেন, তোমরা আনন্দ করো হাসো।
এ গেল প্রাচীন সভ্যতার দেশ গ্রিসের দৃষ্টিভঙ্গি। আর রোমে তো এই দর্শনটুকুও ছিল না। কারণ রোম গ্রিস নয়। রোম তখন ইউরোপের ইতিহাসে এক অমাবস্যার রাত্রে জাত রক্তস্নাত নবীন পশ্চিম। তার পৃথিবীতে বর্বরেরাই প্রথম প্রতিবেশী। পরাজিত দাস দ্বিতীয় মানবগোষ্ঠী। জুলিয়াস সিজার গল দেশে পা দিয়েই তেষট্টি হাজার নরনারীকে ক্রীতদাস করেছেন। হাতে হাতে তাদের শেকল পড়ল। পাউলাস ইরিপাসে গিয়ে পেলেন দেড় লক্ষ। ইহুদিদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে পাওয়া গেল সাতানব্বই হাজার। পারস্য, পার্সিয়া, এশিয়া, মাইনর, গ্রিস, মিসর যেখানেই রোমান সৈন্য সেখানেই হাজার হাজার ক্রীতদাস।
ক্রীতদাসদের মূল্য সেকালের নগণ্য মানুষের মূল্য হিসেবে খুব সস্তা ছিল না। সিজারের আমলে যে কোনো ক্রীতদাসের দাম কমপক্ষে দশ পাউন্ড। একটি রূপসী গ্রিক তরুণীর দাম একশো পাউন্ড। তারপরও সচ্ছল মানুষের ঘরে ঘরে অসংখ্য দাসে ঠাসা।
ক্লাডিয়াসের আমলে স্বাধীন মানুষ ঊনসত্তর লঅক চুয়াত্তর হাজার, আর দাস দুই কোটি বিরাশি হাজার। অথচ আশ্চর্য কেউ এটা নিয়ে ভাবে না। কেউ কেউ প্রস্তাব করেছিল দাসদের পোশাক ভিন্ন করতে, তাহলে বোঝা যাবে কারা স্বাধীন মানুষ আর কারা দাস। কিন্তু সিনেট শোনামাত্র প্রস্তাবটা নাকচ করে দিয়েছিল। কারণ এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে দাসরা জেনে যাবে এ শহরে তারাই সংখ্যাগুরু, তারাই প্রধান। সিনেট সদস্যরা সেই সর্বনাশ ডেকে আনতে পারেন না, কারণ ক্রীতদাসরাই তাদের জীবনের সব। তাদের শক্তি, তাদের অর্থ, তাদের আমোদ, তাদের গৌরব।
সেনেকা দার্শনিক ছিলেন, ম্যক্সিমাসও তাই। তারা এই বিলাস থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, যথার্থ জীবনের সন্ধানে সুখশয্যা ছেড়ে মাটিতে শয়ন করতেন। তাতেও তাদের তৃপ্তি হলো না। শান্তির সন্ধানে তারা শহর ছেড়ে খালি পায়ে গ্রামের পথ ধরে অরণ্যের দিকে এগিয়ে চললেন। অথচ তাদের পেছন পেছন সন্ন্যাসীর দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে চলেছে তাদের দাসেরা। সে যুগে দাসের আসলে মুক্তি কোথায়? নিরো ভোজের আসরে বসে শুভ্যার্থীদের মাঝে দুহাতে দাস-দাসী বিলোতেন। পোল্লিওর ক্রীড়া ছিল নিজের ক্রীতদাস ক্রীতদাসীদের পোষা হাঙ্গর-কুমিরের মুখে ছুড়ে দেওয়া। ক্যাসিয়াস ছয়শো ক্রীতদাসকে ক্রুশবিদ্ধ করার আদেশ দিয়েছিলেন। কনস্টেনটাইনও খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগে কয়েক হাজার ক্রীতদাসকে সিংহের মুখে ছুড়ে দিয়ে অবসর যাপন করেছিলেন।
প্রাচীন পৃথিবীতে দাস প্রথার প্রবর্তন ঠিক কবে থেকে হয়েছিল নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারে না। লুম্বিনী উদ্যানে গৌতম সেদিনও ভূমিষ্ঠ হননি। জেরুজালেমেও শিশু যিশুর নাম কেউ শোনেনি। জুলিয়াস সিজার তখনো গল দেশ আক্রমণ করেননি। সব কটা পিরামিডের কাজ তখনো শেষ হয়নি। বাবর তখনো হিন্দুস্তানের মাটিতে পা রাখেননি। সেন্ট মারিয়া স্পেনের উপকূল ছেড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানে যাত্রা করেননি। ইংল্যান্ডে উইলবারফোর্স নামে কোনো ভদ্র সন্তানের নাম শোনা যায়নি।
তামা আর ব্রোঞ্জের দিন পেরিয়ে সম্ভবত মানুষ তখন সবেমাত্র লোহা হাতে পেয়েছে বর্শার সঙ্গে শেকলের কথা ভাবছে। সেদিন, সেই সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে তাদের অস্তিত্ব বিরাজমান। সিন্ধু উপত্যকায় যেদিন নতুন মানুষের পদসঞ্চার হয়েছিল সেদিন থেকে, নীলনদ অববাহিকায় ফারাওদের আবির্ভাবের আগে থেকে তাদের হাতে তৈরি মহেঞ্জোদারো তাদের হাতেই পিরামিড। নেবুচাঁদ নেজারের পানপাত্রে সাকি হয়ে সুরা ঢেলেছে, থিবস-এ আলেকজান্ডারের সঙ্গে লড়াইয়ে শামিল হয়েছে, হোমারের কালে উলঙ্গ হয়ে খনিতে কাজ করেছে, বাইজেন্টাইন সম্রাটদের ক্ষুধার্ত আত্মাকে তৃপ্ত করতে নিজেদের সিংহের সামনে ছুড়ে দিয়েছে। ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই করতে বাধ্য হয়েছে। আর বাধ্য হয়েছে আপন সঙ্গিনীকে সিংহের মুখে ছুড়ে দিতে। অ্যাস্ফিথিয়েটারে তারা ক্রীড়াবস্তুবৎ হারুন-আল-রশিদের প্রাসাদ অভ্যন্তরে হুরি, তুরস্ক-দিল্লি-লাহোরের হেরেমের দরজায় তারাই খোজাপ্রহরী। হেরেমের অন্তহীন হাহাকারের আরেক নাম খোজা। বর্বরতার নিকৃষ্টতম স্মারক তারা। ব্যাবিলনের লোভী রানী সেমিরাসিস তার বাঁদীদের কলঙ্কশূন্য রাখতে গিয়ে খোজা বানানোর প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। তারপর দেখতে দেখতে সমগ্র প্রাচ্যজুড়ে হেরেমের এক অপরিহার্য অলংকার তারা। হেরেমের দৌবারিক, রক্ষক, বেগমের স্নানের সহচর, ষড়যন্ত্রকারী, বিচারক।
তারা পৌরুষহীন পুরুষ, তারা ক্রীতদাস। শেকলে বেঁধে তাদের টেনে নিয়ে আসা হয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। লাইন করে দাঁড় করিয়ে গরম লোহার কলম দিয়ে শরীরে লিখে দেওয়া হয়েছে একটা নম্বর, কপালে এঁকে দিয়েছে তপ্ত লোহার বান্দাছাপ। এক কোপে মাথা কেটে দিয়েছে, আগুনে পুড়িয়েছে, নির্দ্বিধায় হাত-পা শেকলে বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। এটাই সভ্যতা। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়াজুড়ে তাদের বাস। সারা পৃথিবীজুড়ে তাদের বিকাশ।
আফ্রিকা তখন আর অজ্ঞাত কোনো পৃথিবী নয়। শ্বেতাঙ্গরা বহুদিন ধরে সেখানে আনাগোনা করছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও আগে ১৪৪৪ সন থেকে আধুনিক দুনিয়া গোলামের সন্ধানে সেখানে আনাগোনা করছে। ১৪৯৪ সালে কলোম্বাস প্রথম পাঁচশো ‘রেড ইন্ডিয়ান’কে দাস করে উপহার পাঠিয়েছিলেন রানী ইসাবেলাকে। কিন্তু রানী তাদের ফেরত পাঠিয়েছিলেন স্বভূমে। তখন চিপায়ার মাননীয় বিশপ বলেন, ‘রেড ইন্ডিয়ানদের বাঁচাতে হলে একমাত্র সৎ উপায় হলো, আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গ দাস সরবরাহ করা’। ১৭০০ সনে সেই গিনিতে বসেই স্পেন আর পর্তুগাল কোম্পানি খুলেছে। আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোতে তারা বছরে ‘দশ হাজার টন দাস’ সরবরাহ করবে।
শুধু আফ্রিকান কালো মানুষ না, সাদাদের হাতেও পড়েছে শেকল। অষ্টাদশ শতকেও আমেরিকায় কালোর পাশাপাশি ছিল রাশি রাশি শ্বেতাঙ্গ দাস। ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ এই পাঁচ বছরে একমাত্র নিউ ইয়র্ক বন্দরেই নাকি জাহাজ থেকে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল দুই হাজারের বেশি শ্বেতাঙ্গ দাসের মৃতদেহ। নিউ ইয়র্ক আজ বিরাট নগর বটে, কত না গৌরব তার ইতিহাসে। ওয়ালস্ট্রিট। অথচ বন্দরে জলের নিচে কঙ্কালের পাহাড়।
সাধারণত গবেষণামূলক গ্রন্থ যে ভঙ্গিতে লেখা হয় ‘ক্রীতদাস’ তা নয়। অনেকটা যেন গল্প বলার ছলে উত্তম পুরুষের বয়ানে লেখক শ্রীপান্থ তার ‘ক্রীতদাস’ গ্রন্থের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ করেছেন সভ্যতার নাম করে মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতম অত্যাচার নির্যাতনের এসব বর্ণনা, তার ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ। শ্রীপান্থ বলছেন, ইতিহাসে এমন কিছু আলো-আঁধারি আছে যেখানে একবার প্রবেশ করলে আর বের হয়ে আসা কঠিন।
বই : ক্রীতদাস, লেখক : শ্রীপান্থ
প্রকাশক : আনন্দবাজার পাবলিশার্স, কলকাতা
