দেশের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি জেলায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় এবং বেশিরভাগ জেলা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকায় গোটা দেশকে করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ ঘোষণা দেয়।
ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘যেহেতু বাংলাদেশের বিভিণ্ণ এলাকায় এ রোগের সংক্রমণ ঘটেছে, সেহেতু সংক্রমক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলো।’
এ ঘোষণার ফলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন আইনের ক্ষমতাবলে যখন যেখানে যেভাবে ইচ্ছে নিয়মনীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে। এমনকি সরকার চাইলে জনসাধারণের একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা নিষিদ্ধ করতে কারফিউও জারি করতে পারবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন সারা দেশ করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। অথচ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বা এলাকায় চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। সামাজিক দূরত্বও রক্ষা হচ্ছে না। লকডাউন সত্ত্বেও মানুষের বের হওয়া থামানো যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশ ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই রোগটি নিয়ন্ত্রণে যেসব বিষয় বাস্তবায়ন খুবই জরুরি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন যাতে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, সেজন্য আইনি সুরক্ষা দিতে গোটা দেশকেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলো। এর ফলে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সরকারের এ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার ফলে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা হলো না বলে মনে করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইন প্রয়োগের কথা আগেও বলেছিল এবং সে অনুযায়ী কাজও চলছিল। হঠাৎ করে গোটা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বোঝা গেল পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় নেই। লকডাউন ও লোকজন যাতে রাস্তায় না নামে, সেটা দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ হচ্ছে লোকজনকে চিকিৎসা দেওয়া, হাসপাতাল তৈরি করা, রোগটি যাতে না ছড়ায় সেটার ব্যবস্থা করা। অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও পরিচালক বিভাগ রয়েছে। তাদের কী কাজ বোঝা যাচ্ছে না। এখন হাসপাতাল প্রস্তুত করতে হবে। আইসিইউ, ভেন্টিলেটর বাড়াতে হবে। আক্রান্তরা যাতে ভালো চিকিৎসা পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। পরীক্ষা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বারবার লোকজনকে দোষ দেওয়া হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য বিভাগ সময় অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে পারছে না। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে বলল ঘরে থাকতে, আবার গণপরিবহন খোলা রাখল। খোলা রাখার কথা বলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঢাকায় আনা হলো। লকডাউন দেওয়া হলো, কিন্তু দরিদ্র মানুষকে খাবার ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে না ঠিকমতো। এসব করতে হবে।
গত পাঁচ দিন ধরেই রেকর্ডসংখ্যক মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। গতকালও সর্বোচ্চ রেকর্ড করে এক দিনে ৩৪১ জন আক্রান্ত ও ১০ জন মারা গেছেন। ইতিমধ্যেই দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৪ জেলায় রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের ১৩ জেলার সবই সংক্রমিত হয়েছে ও মোট রোগী পাওয়া গেছে ৫২৭ জন। বিশেষ করে রাজধানীতেই প্রতিদিনই আশঙ্কাজনক হারে রোগী বাড়ছে এবং নতুন নতুন এলাকা আক্রান্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত রাজধানীতে আক্রান্ত হয়েছে গোটা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০৮ জন। গত দুদিন ধরে ছয়টি করে নতুন এলাকা আক্রান্ত হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর ১০৪টি এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে।
রোগটি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটি চলছে। তিন দফা বাড়িয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ। ঢাকাসহ অধিকাংশ জেলায় চলছে লকডাউন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সব দোকানপাট, বাজার বন্ধ। গত কয়েক দিন ধরে করোনা পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। বাড়ছে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যাও। এমন অবস্থায় নতুন করে গোটা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করল সরকার।
ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণায় যা করতে পারবে সরকার : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনোভাবেই মানুষকে লকডাউন মানানো যাচ্ছে না। লোকজন ঘরের বাইরে আসছে। আমাদের পরামর্শ মানছে না। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করছে না। মানুষকে এসব পরামর্শ মানতে বাধ্য করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলো।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কি এখন কারফিউ জারি করতে পারে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, সরকার সেটা এখনো পারে। সরকারের সে ক্ষমতা আছে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবেই আইন প্রয়োগ করতে পারবে।
হঠাৎ করেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা নয় জানিয়ে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজদ বলেন, করোনার বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করা হয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে গত কয়েক দিন ধরে যে হারে রোগী বাড়ছে, সে হারে লোকজনকে নিয়ম মানানো যাচ্ছে না। এখন তাদের নিয়ম মানাতে সংক্রমক রোগ আইনের সব ধারা বাস্তবায়ন করতে পারবে। অর্থাৎ আইনি সুরক্ষা বা আইনকে সুদৃঢ়ভাবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হলো।
ঘোষণায় যা বলা রয়েছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গোটা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অদ্য ১৬ এপ্রিল ২০২০/০৩ বৈশাখ ১৪২৭ তারিখে আমার স্বাক্ষরমতে এ আদেশ জারি করা হলো।’
ঘোষণায় বলা রয়েছে, ‘যেহেতু, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিশ্বব্যপী করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করায় লক্ষ লক্ষ লোক আক্রান্ত হয়েছে ও লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেছে এবং বাংলাদেশের বিভিনড়ব এলাকায় এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। হাঁচি, কাশি ও পরস্পর মেলামেশার কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে এ রোগের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এ রোগের একমাত্র প্রতিষেধক হলো পরস্পর হতে পরস্পরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করা।
যেহেতু, জনসাধারণের একে অপরের সাথে মেলামেশা নিষিদ্ধ করা ছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় এবং যেহেতু, বাংলাদেশের বিভিণ্ণ এলাকায় এই রোগের সংক্রমণ ঘটছে। সেহেতু, সংক্রমক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১নং আইন) এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলো।
সংক্রমিত এলাকার জনসাধারণকে নিম্নলিখিত নির্দেশাবলি কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো : (১) করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রশমনে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। অতীব জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। (২) এক এলাকা হতে অন্য এলাকায় চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলো। (৩) সন্ধ্যা ৬টা হতে সকাল ৬টা পর্যন্ত কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। এ আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ওপরের বর্ণিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিয়ে আইনের সংশ্লিষ্ট অন্য ধারাগুলো প্রয়োগ করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।’
কী আছে সংক্রমক রোগ আইনে : করোনাভাইরাসকে (কভিড-১৯) সংক্রমক রোগ হিসেবে গত ২৩ মার্চ অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। ‘সংক্রমক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’-এর আওতায় নতুন এ রোগকে সংক্রমক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় বর্তমানে সংক্রমক রোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৪। আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংক্রমক রোগের প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে ব্যবস্থা গ্রহণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। আইনটিতে অধিদপ্তরকে সুনির্দিষ্ট করে ১৭টি করণীয় পালনের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দায় বহনের কথা বলা হয়েছে অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। আইনে এ ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে জরিমানা, জেলসহ সরকার যেকোনো বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
আইনের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন সংঘটিত কোনো অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।’
২৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপসযোগ্য হইবে।’
আইনের ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের কোনো বিধানের অস্পষ্টতার কারণে উহা কার্যকর করিবার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা দেখা দিলে, সরকার এই আইনের অন্যান্য বিধানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে, সরকারি গেজেটে প্রকাশিত আদেশ দ্বারা, উক্ত বিধানের স্পষ্টকরণ বা ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক উক্ত বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করিতে পারিবে।’
বিধি প্রণয়নের এখতিয়ার দিয়ে আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে।’
৪৪ এলাকায় করোনা : গতকাল পর্যন্ত ঢাকায় ৬০৮, নারায়ণগঞ্জে ২১৪, গাজীপুরে ৫৩, চট্টগ্রামে ৩১, নরসিংদীতে ২৮, মুন্সীগঞ্জে ২১, মাদারীপুরে ১৯, কিশোরগঞ্জে ১৭, কুমিল্লায় ১৪; গাইবান্ধা ও জামালপুরে ১২ জন করে, বরিশালে ১০; গোপালগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে ৯ জন করে করোনাভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে ৭ জন করে; চাঁদপুর, নীলফামারী ও রাজবাড়ীতে ৬ জন করে; মানিকগঞ্জ ও শরীয়তপুরে ৫ জন করে; বরগুনা, নেত্রকোনা, পিরোজপুর ও রাজশাহীতে ৪ জন করে; ঝালকাঠি, শেরপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ জন করে; ফরিদপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, পটুয়াখালী ও রংপুরে ২ জন করে এবং চুয়াডাঙ্গা, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী ও সুনামগঞ্জে একজন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে।
ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ইতিমধ্যে ৪৮টি জেলা লকডাউন করেছে প্রশাসন। এর বাইরেও কিছু উপজেলা এবং কিছু অঞ্চলে লকডাউন জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
