বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিণ্ণ স্থানে গতকাল বৃহস্পতিবারও পোশাকশ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। এর মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুর, কমলাপুর, মিরপুর, দক্ষিণখান, মতিঝিল ও বিমানবন্দর সড়কে শ্রমিকরা অবস্থান নেন। করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের লকডাউন ভেঙে গাজীপুরে শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এতে পণ্যবাহী অনেক পরিবহন আটকা পড়ে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হক জানান, তাদের সদস্যভুক্ত ৮৭ শতাংশ শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। যেসব কারখানায় আন্দোলন হয়েছে, সেখানে বেতন-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে বেতন দিয়েছে। বাকিরা শ্রমিকদের থেকে সময় নিয়েছে। এরপরও যেসব কারখানায় বেতন বকেয়া আছে, সেগুলোতে যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। একইভাবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) পরিচালক ফজলে শামীম এহসান জানান, তাদেরও সদস্যভুক্ত প্রায় ৮৫ শতাংশ কারখানার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ছোটখাটো কারখানা হঠাৎ রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে বেতন দিতে দেরি হচ্ছে। সবাই মিলে তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সব কারখানার বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। রাজধানীতে বিক্ষোভ : করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্বের বিষয় উপেক্ষা করে কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও রাজধানীর কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তারা জানান, কারও দুই মাস, কারও এক মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া। করোনার কারণে বন্ধ কারখানা।
জরুরি ত্রাণও পাননি। তাই পেটে ক্ষুধা নিয়ে বাধ্য হয়ে সড়কে এসেছেন।পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিতের দায় পোশাক মালিক ও বিজিএমইএর। কিন্তু পুলিশকে এখন এসব সামাল দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের খুঁজে না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। গতকাল দুপুরে মিরপুর এলাকার রূপনগরের মনির ফ্যাশনের শতাধিক শ্রমিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তারা জানান, তিন দফা সময় নিয়েও মার্চের বেতন পরিশোধ করেনি কর্তৃপক্ষ। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মিজানুর জানান, মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে বেতন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে শ্রমিকরা ফিরে যান। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বকেয়া ও জরুরি ত্রাণ সহায়তার দাবিতে বিমানবন্দর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধ করেন উত্তরা ও দক্ষিণখান এলাকার রেদওয়ান, সিএনবি ও স্যার ডেনিম কারখানার কর্মীরা।
পুলিশ তাদের সড়ক ছেড়ে দিতে বললেও আন্দোলন চালিয়ে যান। যোগাযোগ করে মালিকপক্ষের সাড়া না পেয়ে বিষয়টি বিজিএমইএকে জানায় পুলিশ। দক্ষিণখান থানা ফাঁড়ির ইনচার্জ সবুজ রহমান বলেন, ‘রেদওয়ান কারখানার ৩ মাস, সিএনবি ও স্যার ডেনিম কারখানার মার্চ মাসের বেতন বকেয়া। আন্দোলনের খবর পেয়ে আমরা এসে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের একজন কোয়ারেন্টাইনে, একজন পলাতক ও আরেকজন বেতন দিতে অপারগতা জানান। পরে বিষয়টি বিজিএমইএকে জানানো হয়।’
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের দক্ষিণখান জোনের এডিসি হাফিজুর রহমান জানান, পোশাককর্মীদের সামলানোর দায়িত্ব পুলিশের নয়। কিন্তু এখন সেটাই করতে হচ্ছে। কিন্তু মালিকদের খুঁজে না পাওয়ায় জটিলতা বাড়ছে। এদিকে মতিঝিলে বিক্ষোভ করেন সরদার কারখানার কর্মীরা। পরে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়। মতিঝিল থানার এসআই তৈয়ব আলী জানান, সরদার কারখানার মালিককে ডেকে এনে বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। এরপর শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দেন।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ : করোনা পরিস্থিতিতে গাজীপুরের লকডাউন উপেক্ষা করে গতকাল সকাল থেকে ফের বিভিণ্ণ স্থানে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে থানা ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বেতন পরিশোধের আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা চলে যান। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পরিদর্শক শহীদুল্লাহ জানান, নগরীর তিন সড়ক এলাকায় স্টাইলক্রাফট পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দ্বিতীয় দিনের মতো ঢাকা-গাজীপুর সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর কর্তৃপক্ষ ২৭ এপ্রিল বেতন দিতে চাইলে তারা চলে যান।
মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ইলিবাট কিংসওয়্যার লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। কর্তৃপক্ষ ২১ এপ্রিল বেতন পরিশোধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। একই দাবিতে নাওজোড় এলাকায় প্রোমোডিয়াল কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। পরে ২০ এপ্রিল বেতন পরিশোধের আশ্বাস দিলে তারা চলে যান। এ ছাড়া কোনাবাড়ি, বোর্ড বাজার এলাকায়ও বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন।
সোনারগাঁয়ে বিক্ষোভ : সাত মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে গতকাল সোনারগাঁয়ের টিপরদী এলাকায় কারখানার সামনে বিক্ষোভ করেন ইউসান নিট কম্পোজিট লিমিটেডের শ্রমিকরা। পরে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কে পণ্যবাহী পরিবহন আটকা পড়ে। পরে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। শ্রমিকরা জানান, গত কোরবানির ঈদের পর থেকে তারা কোনো বেতন-ভাতা পাননি। বারবার সময় দিয়েও বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। এরই মধ্যে করোনা পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইউসান নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ম্যানেজার মো. আকতার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়
