এবারই প্রথম সীমিতভাবে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:০২ পিএম

স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম করোনাভাইরাস সর্তকতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস সীমিত আকারে অনাড়ম্বরভাবে পালিত হচ্ছে। বাইরের জেলা থেকে এবং অভ্যন্তরীণভাবে লোক সমাগমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তারপরও নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে সরকারিভাবে মেহেরপুরে মুজিবনগরে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস।

কুয়াশাছন্ন ভোর ৬টায় ঐতিহাসিক মুজিবনগর আম্রকাননে পুলিশের একটি চৌকসদল ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে কর্মসূচির শুভ সুচনা করে। পরে, সেখানে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা প্রশাসক আতাউল গনি।

উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার এস.এম মুরাদ আলী। এ সময় গার্ড অব অনার করেন পুলিশের অপর একটি সুসজ্জিত দল।

পরে, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় ৪ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সহ জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশের পক্ষে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষে সেখানে ফুল দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের একজন প্রতিনিধি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শাহিদুজ্জামান খোকন, মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রসুল, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ইয়ারুল ইসলাম, মেহেরপুর পৌর মেয়র মাহফুজুর রহমান রিটন ও গাংনী পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলাম।

করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে তারা প্রত্যেকে এককভাবে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বৈশ্বিক মহামারীর করোনাভাইরাস কারণে এ বছরে প্রতিটি অনুষ্ঠানে নেওয়া হয়েছে শিথিলতা। মানা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। সবশেষে করোনাভাইরাস দূরসহ সামাজিক শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া মোনাজাত করা হয়।

১৯৭১ এর এই দিনে মেহেরপুরের মুজিবনগরে সুবিশাল আ¤্রকুঞ্জ (তৎকালীন সময়ে বৈদ্যনাথতলা) নিচে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম সরকারের শপথ, গার্ড অব অনার, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠান।

ওইদিন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে এজিএম ওসমানিকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। সেদিন স্থানটির নামকরণ হয় মুজিবনগর। একই সাথে মুজিবনগরকে দেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এদিন ভারতের কলকাতা থেকে বাংলাদেশের জাতীয় সমস্ত নেতারাসহ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা গাড়ি বহর নিয়ে এই মুজিবনগরে সমবেত হন।

পাক হানাদার বাহিনীর হামলা উপেক্ষা করে কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে সেদিন মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান হয়। এই মুজিবনগর সরকারই দেশের ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করে একটি ভূখণ্ড, লাল সবুজের পতাকাসহ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম স্থান করে দিয়েছিল।

সেদিন মুজিবনগরে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগারে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে), তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে আইন ও পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী, এম মনসুর আলীকে অর্থ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে দেশের প্রথম সরকার গঠন করে নাম ঘোষণা করা হয়।

তখন মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বর্তমানের সরকারের জ¦ালানি উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি চৌধুরী। তিনিই এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। দেশর প্রথম সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মুজিবনগরের ১২ আনসার সদস্য।

প্রথম সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী আনসার সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, বৈশাখীর কত ঝড়ঝঞ্ঝা গেছে রাজনৈতিক কত বাধা এসেছে তারপরও স্বাধীনতার পরবর্তী সমস্ত বছরে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষ্যে সেখানে মানুষের ঢল নেমেছে। এবারই প্রথম করোনা ভাইরাসের কারণে এই ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যমণ্ডিত এই দিনটি ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে দেখে খুব খারাপ লাগছে। কেননা এই দিনটির জন্য দেশের মুক্তিযোদ্ধারা আমরা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকি।

মুজিবনগর উপজেলা সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম চান্দু জানান, মুজিবনগর মানুষের কাছে এই দিনটি ঈদের মত আনন্দের। এই দিনটিকে ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষ বছরজুড়ে নান পরিকল্পনা করে। এবার সব ভেস্তে গেল। এমন মুজিবনগর দিবস তিনি ৪৫ বছরে দেখেননি বলে জানান।

মুজিবনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনার কারণে দলীয় সমাবেশসহ সব ধরনের জমায়েত বাতিল করা হয়েছে। এই দিনটিতে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় লাখো মানুষ প্রতিবার মুজিবনগরে সমবেত হয়। বিএনপি, জামায়াত ও স্বৈরাচারের সময়েও মুজিবনগরে দিবসে মানুষের ঢল কেউ থামাতে পারেনি। কিন্তু এবারই প্রথম নীরবে মুজিবনগর দিবস পালিত ঘটনাটি মুজিবনগরের মানুষ হিসাবে খুবই কষ্ট লাগছে। কেননা, এই দিনটি না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হতো না। আমরা লাল সবুজের পতাকা নিজ ভূখণ্ড পেতাম না।

মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওসমান গনি জানান, করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুজিবনগরের সব কর্মসূচি শিথিল ও বাতিল করা হয়েছে। মুজিবনগরে যেন জনসমাগম না ঘটে সেজন্য সমস্ত প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খুবই সীমিতভাবে কিছু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সরকারিভাবে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত