‘ঝুঁকি নিয়েই আমরা চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি’

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০১:৫৫ এএম

টিভি উপস্থাপক ও ডাক্তার শ্রাবণ্য তৌহিদা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানালেন তার অভিজ্ঞতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুদীপ্ত সাইদ খান

কাজ কেমন চলছে? এখন আমার মিডিয়ার কাজ তো বন্ধ। তবে আমি যেহেতু ডাক্তার, ফলে আমাকে এ লকডাউনের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালন করছি। সতর্কতা কতটুকু রাখছেন? সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েই আমরা কাজে যাচ্ছি। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন যে, সতর্ক থাকার পরও অনেক ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। একজন ডাক্তার তো মারাই গেলেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে করোনা নিয়ে। এখনো অনেক মানুষ বোঝেই না এটা কীভাবে ছড়ায়। অনেকে মনে করছেন তার কোনো লক্ষণ নেই, ফলে তিনি সুস্থ। কিন্তু ব্যাপারটা এমনও তো হতে পারে লক্ষণ ছাড়াই হয়তো আপনি নীরব বাহক হিসেবে রোগাটাকে বহন করে চললেন। আপনার কারণে হয়তো অন্য একজনের ভেতর ছড়াল, যার হয়তো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ফলে সে হয়তো মারা গেল। এ বিষয়গুলো কেউই ভাবছে না। ফলে অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। ডিউটি শেষে পরিবারের সামনে যাওয়ার আগে কী কী ব্যবস্থা নেন? পিপিই পরেই চিকিৎসাসেবা দিই। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় পিপিই খুলে ড্রয়ারে রেখে বাসায় আসি। বাসায় আসার পর গোসল করি। পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন হয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে যাই। আর সবসময় হাত তো ধুতেই হয়। নতুন পোশাক পরি। কিন্তু এটা একটা মেন্টাল ট্রমা।

কতদিন যে এ অবস্থা থাকবে আল্লাহতায়ালা জানেন। অসহায়দের সহায়তা... যারা সামর্থ্যবান তারা দু-চার মাস ঘরে বসে খেলেও হয়তো তেমন কিছু হবে না। কিন্তু একেবারে খেটে খাওয়া মানুষদের চলবে না। সে ক্ষেত্রে খুব কম পরিমাণ টাকা হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের যেন হেল্প করা হয়। আমি নিজে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনে ডোনেট করেছি। আরও করব। সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার ঈদে কেনাকাটা না করে ওই টাকাটা দরিদ্রদের মাঝে দেব। আমার খুব খারাপ লেগেছে, খাবারের জন্য একজন ভ্যানচালক আত্মহত্যা করল। একটা মেয়ে মারা গেল। তো এগুলো শোনার পর বেশ খারাপ লাগছে। এমন আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে। আপনি দেখেন, ন্যাচার বলেন বা সৃষ্টিকর্তা বলেন, যে যাই বলুক না কেন, সবাইকে কিন্তু প্রকৃতি ঘরে বন্দি করে রেখেছে। এর থেকে হয়তো একটা উপলব্ধি জন্মাতে পারে, মানুষ মানুষের জন্য।

আমি বাঁচি আমার জন্য, আমার পরিবারের জন্য; ব্যাপারটা যেন তা না হয়, সেটা যেন সবার জন্য বাঁচা হয়। করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? কভিডের গতি-প্রতিকৃতিও ইদানীং চেঞ্জ হয়ে গেছে। আমাদের একজন রোগী যার ভেতরে কভিড-১৯-এর কোনো লক্ষণ ছিল না। কিন্তু পরে যখন এক্স-রে করা হয় তখন নিউমোনিয়া দেখা গেছে। তারপর সন্দেহ থেকে কভিড পরীক্ষা করার পর তার করোনা পজিটিভ আসে। এর ভেতর একজন রোগী তথ্য গোপন করে হাসপাতালে ভর্তি হন, পেটব্যথার কথা বললেও পরে পরীক্ষা করলে কভিড পজিটিভ আসে। পরীক্ষা করতে করতেই লোকটি মারা যান। আমাদের হাসপাতালের সেই ওয়ার্ডটি এখন লকডাউনে রাখা হয়েছে। মানবিক আবদার... আমি সবার প্রতি দুটি মানবিক আবদার জানাতে চাই। একটা আগেই বলেছি যারা সামর্থ্যবান তারা সহায়তা করবেন।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে, অনেক ডাক্তারই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। নার্স, ওয়ার্ড বয়, টেকনোলজিস্টরা সেবা দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশে ডাক্তার মানেই যেন ভিলেন। করোনার সময়ে তারা আবারও ভিলেন হিসেবে হাজির হয়েছেন। আর খারাপ বিষয়টা এ দেশের মানুষ বেশি লুফে নেয়। কিন্তু যে ডাক্তাররা ডিউটি করছেন তাদের কি পরিবার নেই? তাদের কি মন খারাপ হচ্ছে না? তারা কিন্তু রিস্ক নিয়ে কাজ করছেন।

তাদের মনোবল কিন্তু স্ট্রং রাখা দরকার। বিদেশে তাদের স্যালুট করা হচ্ছে আমরা কিন্তু তা করছি না বরং নেগেটিভ সমালোচনা করছি। এটা না করে তাদের পজিটিভ সাহস দেওয়া দরকার। আমি ডাক্তারদের উৎসাহ দিতে চাই, তাদের স্যালুট দিতে চাই। শুধু ডাক্তারদের নয়, কর্তব্যরত সাংবাদিক, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, প্রশাসনসহ যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তাদের শ্রদ্ধা জানাই। সেই সঙ্গে সবার প্রতি অনুরোধ, আপনারা এ মানুষগুলোকে সম্মানের চোখে দেখুন, উৎসাহ দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত