দেশে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এক শ্রেণির লোক এ মহাদুর্যোগের সুযোগে নিজেদের পকেট ভারী করার তৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছে। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিপুলসংখ্যক করোনা প্রতিরোধী সামগ্রীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল। এই সামগ্রীর মধ্যে করোনা শনাক্তের টেস্টিং কিটও রয়েছে, যা বেসরকারিভাবে বিক্রি হওয়ার কথা নয়। অথচ এই চক্রটি এসব সামগ্রী মজুদ করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছিল।
জানা গেছে, একজন ব্যক্তির কাছে কয়েকগুণ দামে এই চক্রটি মাস্ক বিক্রি করেছিল। তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে এ বিপুল পরিমাণ টেস্টিং কিটসহ করোনা প্রতিরোধী সামগ্রী জব্দ করে। আটক ব্যক্তিদের হেফাজত থেকে ২৭৫ পিস করোনা টেস্টিং কিট, ৯ হাজার ৫০ পিস সাধারণ মাস্ক, ১০০ পিস এন৯৫ মাস্ক, ১৯৮ পিস পিপিই, ৯৬০ জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস, ২৫০ জোড়া চশমা, ৯০০টি ক্যাপ, ১ হাজার ৪৪০টি শু-কাভার উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়েছে। বেসরকারিভাবে টেস্টিং কিট সংগ্রহ ও বিক্রির অনুমোদন নেই। তারপরেও তাদের হাতে এ টেস্টিং কিট আসার ব্যাপারটি বিস্ময় তৈরি করেছে।
করোনা শনাক্তের জন্য টেস্টিং কিটের মাধ্যমে পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয়, সেই কিট কীভাবে ল্যাবরেটরির ব্যবস্থাপনা ছাড়া খোলাবাজারে বিক্রি হয়? হয়তো অনেকের মধ্যেই করোনা সংক্রমণের বিষয়টি নিয়ে ভীতি কাজ করছে। তারা ভাবছে, যদি করোনা শনাক্ত হয়, তাহলে তাদের সরকারিভাবে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন সেন্টারে রাখার বন্দোবস্ত করা হবে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও আছে সেজন্য তারা গোপনে টেস্টিং কিট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন কি না অসাধু একটি চক্র সে সুযোগ নিচ্ছে কি না এবং সেক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ যোগসাজশ করছে কি না, সেটা তদন্তের দাবি রাখে। আর যদি টেস্টিং কিটগুলো নকল হয়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর সংকট তৈরি করবে। এগুলো কী করে অনলাইনেও সরাসরি বিক্রি হচ্ছে সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ পর্যন্ত ৯২ হাজার পিসিআর কিট সংগ্রহ করে ২১ হাজার কিট বিভিন্ন হাসপাতাল ও পরীক্ষাগারে বিতরণ করেছে। তবে এর বাইরেও চীন থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে র্যাপিড টেস্ট কিট এনে হাসপাতালে বিতরণ করেছেন অনেকে, যেসব কিট দেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত নয়। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষক দল দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের সহায়তায় স্বল্পমূল্যে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের কিট উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছে। আগামী ২৩ এপ্রিল তারা এই কিট বিভিন্ন সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে বলে জানিয়েছে। তারপরেও করোনা শনাক্তের জন্য সংগৃহীত কিটকে অপর্যাপ্ত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অপর্যাপ্ততার মধ্যে যদি এসব সরঞ্জাম নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়, তাহলে পরিস্থিতি কত ভয়াবহ হবে তা সহজেই বোধগম্য।
বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণে জনজীবন যখন বিপন্ন, টেস্টিং কিট, পিপিই ও মাস্কের অভাবে ভাইরাসের চিকিৎসা সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক তখনই আটক ব্যক্তিরা অধিক মুনাফার লোভে অতিজরুরি এসব পণ্য অবৈধভাবে গুদামজাত করে রেখেছেন। যা মেনে নেওয়া যায় না। খোলাবাজারে টেস্টিং কিট বিক্রি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার কয়েকগুণ দামে মাস্ক, পিপিই বিক্রির ব্যাপারটিও হতাশাজনক। খোলাবাজারে এরকম অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা আরও রয়েছে কি না সেটি তদন্ত করে দেখতে হবে এবং এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, করোনাভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণের এই মহাদুর্যোগে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এ ধরনের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
