উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ব্যয় হবে জনকল্যাণে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১২ এএম

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কেউ যেন খাবারের কষ্ট না পায় সেজন্য সরকারের বিভিনড়ব পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা হাত পাততে পারবে না, কিন্তু তাদের ঘরে খাবার নেই, চাইতে পারছে না তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সেই ব্যবস্থাটাও কিন্তু আমরা নিয়েছি এবং নিচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের খাদ্যের অভাব নেই এবং হবে না। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদের সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।’ প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে যা এখনই শেষ করার দরকার নেই। এগুলো থেকে টাকা বাঁচিয়ে আমরা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারি।’

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে চলতি সংসদের সপ্তম এ অধিবেশন বিকেল ৫টায় শুরু হয়। সরকার প্রধান বলেন, ‘অনেক সময় আমি নিজেও এসএমএস পাই, এসএমএস করে ‘আপা আমার ঘরে খাবার নেই’। সঙ্গে সঙ্গে আমরা উদ্যোগ নিই। শুধু তার (ওই মেসেজদাতা) নয়, আশপাশে কোথায় কারা এভাবে কষ্টে আছে।’

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সাধারণ মানুষ ঘরে থাকতে সরকারি নির্দেশনা না মানায় উষ্মা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের মানুষ সাহসী হতে গিয়ে একটু বেশি সাহসী হয়ে গেছেন। তাদের বারবার ঘরে থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিনরাত যথেষ্ট কষ্ট করছে। কিন্তু কেন যেন মানুষ এটা মানতে চায় না। দেখা যায় এখানে বসে আড্ডা, ওখানে বসে গল্প। এটা করে তারা নিজেও ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্য দশজন মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলছেন।

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষায় ব্যতিক্রমী এ অধিবেশন শুরু হয় বাছাইকৃত সংসদ সদস্যদের (এমপি) নিয়ে। সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে এতে অংশ নেন এমপিরা। অধিকাংশের মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে যেন খাদ্য ঘাটতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখছে সরকার। বর্তমানে ৫০ লাখ মানুষকে রেশন কার্ড দেওয়া হচ্ছে।

আরও ৫০ লাখ লোককে রেশন কার্ড দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এক কোটি লোক খাদ্য সহায়তা পাবেন। আর এই এক কোটি লোকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি পাঁচজন হয়, তাহলে পাঁচ কোটি লোক খাদ্য সহায়তার আওতায় আসবেন। খাদ্যে যেন কোনো সমস্যা না হয় সে ব্যবস্থা আমরা করতে পারব।

শেখ হাসিনা বলেন, এই করোনা নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। অনেক চিন্তা হচ্ছে। অনেকেই বলছে শীত হলে বেশি হয়, গরম হলে কমে। আবার বলে গরম হলেও থাকবে। এর স্থায়িত্ব কী, অদ্ভুত একটা অবস্থা সারা বিশ্বে। কত শক্তিশালী দেশ, কত তাদের শক্তিশালী অস্ত্র। কোনো কিছুই কাজে লাগছে না। একটা ভাইরাস যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার কারণে সারা বিশ্ব স্থবির।

সারা বিশ্বের মানুষ ঘরে বন্দি। এরকম অদ্ভুত পরিস্থিতি বোধ হয় আর কখনো হয়নি। ‘এজন্য আমরা আশু করণীয় হিসেবে মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিয়েছি। আগামী তিন বছর অর্থনৈতিকভাবে দেশের মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছি। এই সংকট যেন কাটিয়ে উঠতে পারি সেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। অর্থনৈতিকভাবে যে নেতিবাচক দিকগুলো সামনে আসতে পারে সেটা যেন আমরা মোকাবিলা করতে পারি, মানুষের কর্মসংস্থান, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়া, মানুষের জীবনটা যেন চলতে পারে এজন্য সর্বস্তরের যেমন শিল্প, কৃষি, একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, নিমড়ববিত্ত, মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক, তাঁতি, ব্যবসায়ী সবার কথা বিবেচনা করে আমরা এই প্যাকেজ তৈরি করেছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি, তা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আমি আজ দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, আমাদের ৩৩৩ যে হটলাইন আছে সেটিতে সংযোগ রেখে এই ধরনের পরিস্থিতিতে যারা পড়বে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। আল্লাহর রহমতে আমাদের খাদ্যের অভাব নেই এবং হবে না। সেই সঙ্গে কৃষিকাজ যেন অব্যাহত থাকে এজন্য ৫ শতাংশ সুদের কথা বলেছিলাম ওটা এখন কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছি। তাছাড়া দুই কোটি কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তাদের ভর্তুকি পাবেন।

এছাড়া কৃষি শ্রমিকরা কোথাও কাজ করতে যেতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে, তারা যেন ধান কাটার শ্রমিকদের পৌঁছে দেন। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে কতই-না শক্তিশালী দেশ, কত তাদের শক্তিশালী অস্ত্র। কোনো কিছুই কাজে লাগল না। একটা ভাইরাস যেটা চোখে দেখা যায় না, তার কারণে সারা বিশ্ব স্থবির। সারা বিশ্বের মানুষ ঘরে বন্দি। এ ধরনের অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বোধহয় আর কখনো কেউ পড়েনি। বিভাগীয় শহর জেলা ও উপজেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে পৃক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, মোট আইসোলেশন ওয়ার্ড সংখ্যা ৬২০০। এছাড়া ভবিষ্যতের জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করার। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি কিছু বেসরকারি হাসপাতালকে অনুরোধ করা হয়েছে যদি রোগীর সংখ্যা বাড়ে, তাহলে সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা করার জন্য। করোনাকালে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম সংসদ অধিবেশন : করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সারা দেশে অচলাবস্থার মধ্যে সংবিধানের ‘নিয়ম রক্ষায়’ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের সংসদ অধিবেশন হয়ে গেল। যা চলে দেড় ঘণ্টারও কম সময়।

অধিবেশনের সমাপনী সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে শোনানোর আগে স্পিকার শিরীন শারমিন দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘আসুন আমরা ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে এই সংকট উত্তরণ ঘটাই। আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি, নিয়মিত ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করি। নিজ বাড়িতে অবস্থান করি। আমাদের সবার দায়িত্বশীল আচরণ এই সংকট উত্তরণের পথ সহজ করবে।’

পরে স্পিকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করেন। রাষ্ট্রপতি তার আদেশে বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ১ দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আহত একাদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসমাগম পরিহার করার জন্য জনস্বার্থে সমাপ্তি ঘোষণা করিতেছি।

সংসদ অধিবেশনে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কোরাম পূর্ণ হওয়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন ৬০ জন বা তার সামান্য কিছু বেশি সদস্য সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন বলে আগেই সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য প্রবীণ সংসদ সদস্য এবং ঢাকার বাইরে অবস্থানকারী সংসদ সদস্যদের উপস্থিত হতে আগেই নিরুৎসাহিত করা হয়। সংসদের এক অধিবেশন শেষ হওয়ার পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে আবার সংসদ বসার বাধ্যবাধকতা সংবিধানে রয়েছে। সর্বশেষ ষষ্ঠ অধিবেশন শেষ হয়েছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে সংসদের অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা ছিল।

অধিবেশন চলাকালে সংসদ ভবনে জনসমাগম এড়াতেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের খবর সংগ্রহে সংসদে না যেতে অনুরোধ করা হয়। এছাড়া অধিবেশনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্যদের উপস্থিত না হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত