সরাইলের ওসি প্রত্যাহার

আট গ্রাম লকডাউন

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০৫:৪৬ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খেলাফতে মজলিশের নায়েবে আমির মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নেওয়ায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে বেড়তলাসহ আটটি গ্রামকে নতুন করে লকডাউনে নিতে কাজ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব গ্রামের মানুষকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া গ্রামভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে, যারা ঘরবন্দি মানুষকে খাদ্য ও ওষুধ সামগ্রী পৌঁছে দিতে কাজ করবে।

এদিকে জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণের ঘটনায় সরাইল থানার ওসি শাহাদাত হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ বাসভবনে মাওলানা আনসারীর মৃত্যুর পরই এমন লোকসমাগমের বিষয়টি ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির এমন আশঙ্কা করলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরাইলের ওসিকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে হওয়া এই জানাজায় জনসমাগমের ছবি সামাজিক যোগাযোগের বিভিণ্ণ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে খবর আসে। এতে চাপে পড়ে সরাইল উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। এরপর তারা নড়েচড়ে বসে।

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম মোসা, সরাইল সার্কেল এএসপি মাসুদ রানার নেতৃত্বে আশুগঞ্জ ও সরাইল থানার পুলিশ একযোগে গতকাল বিকেল ৫টায় জানাজা এলাকায় সতর্কতা বাড়াতে নামেন।

এ বিষয়ে সরাইলের ইউএনও এ এস এম মোসা গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জানাজায় যে এত মানুষ জড়ো হবে তা আমরা বুঝতে পারিনি। এখন সামাজিক সংক্রমণ ঠেকাতে মাঠে কাজ করছি। বিকেল থেকেই জানাজাস্থল বেড়তলাসহ আশুগঞ্জ উপজেলার তিন ও সরাইল উপজেলার পাঁচ গ্রামকে নতুন করে কঠোর লকডাউনের আওতায় আনার কাজ শুরু করি। ওই সব গ্রামে আলাদা আলাদা লকডাউন মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মাইকিং করে প্রচারণা চালাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘এক গ্রামের মানুষ যেন অন্য গ্রামে না যেতে পারে আগামী ১৪ দিন সেই ব্যবস্থা করব। তারা সবাই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবে। গ্রামে গ্রামে কমিটি করে দিয়েছি। কমিটির লোকজন আমাদের সহায়তা করবে। সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বেরোতে পারবে না। তাদের ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কমিটির লোকজন পৌঁছে দেবে। সব প্রয়োজনেই উপজেলা প্রশাসন সহায়তা করবে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারও সময়মতো তাদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে।’

এদিকে জানাজায় লাখো মানুষের সমাগমের পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের কর্তাব্যক্তিরাও এলাকায় টহল দিচ্ছেন। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। তারা আমাদের আশ^স্ত করেছিলেন করোনা পরিস্থিতির কারণে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি বজায় রাখবেন। কিন্তু বিচ্ছিণ্ণভাবে বিভিণ্ণ জায়গা থেকে লোকজন গিয়েছে। এখন আমরা ওই এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামে কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করব। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. একরাম উল্লাহ বলেন, ‘জানাজার আশপাশের গ্রামের মানুষদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে ব্যবস্থা করবে প্রশাসন। আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেব।’

ঢাকার খুব কাছাকাছি ও ভারত সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া করোনা-সংকটের শুরু থেকেই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। কয়েক দিন ধরে করোনা আক্রান্তের খবরও বাড়ছে লাফিয়ে। এ অবস্থায় প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে ১১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। এই অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেও লাখো মানুষের অংশগ্রহণে মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজা হয়েছে। এই জানাজা হয় গতকাল সকালে সরাইল উপজেলার বেড়তলা এলাকার জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা মাঠে। মাঠে জায়গা না হওয়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অন্তত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় মানুষ অবস্থান করে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকেই আতঙ্কিত। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ গতকাল দুপুরে বলেন, একসঙ্গে এত মানুষের সমাগমে সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, করোনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় গতকাল পর্যন্ত ১৭ জন শনাক্ত হয়েছে। আর দুজন মৃত ব্যক্তির শরীরে আমরা করোনা সংক্রমণের নমুনা পেয়েছি।

তবে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ৯।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত