ভিভ রিচার্ডসের সর্বজয়ী উইন্ডিজ নিয়ে এই গল্পটা লিখেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত ক্রিকেট বিশ্লেষক কিশোর ভিমানি। ‘১৯৮৯-এর ক্যারিবিয়ান গ্রীষ্ম। আমি অ্যান্টিগায় ভিভের অতিথি। দ্বীপটার জনসংখ্যা তখন লাখেরও কম। ছড়ানো-ছিটানো কিছু আখের খেত আর প্রসেসিং কারখানা। দ্বীপের জীবন তখন গয়ংগচ্ছ। ধীর লয়ের। রাজধানী সেন্ট জনসে ছিল বিলাসবহুল কিছু ক্যাসিনো আর নাইটক্লাব। ওখানকার জুয়ার টেবিলে ও বারে যা সম্ভাষণ পেতাম, সত্যি বলছি, পরে কোথাও তা পাইনি। মনে আছে কোনো কিছুর জন্যই আমাকে টাকা দিতে হতো না। কারণ, গ্রেটম্যানের সঙ্গে ছিলাম যে! যে সময়টার কথা বলছি, তখন ই-মেইল বা ফ্যাক্স আসেনি। গ্রানাডা হয়ে বার্বাডোজ যাওয়ার ফ্লাইটে ভিভের কাছে ওর ঠিকানা চাইলাম। খুব সিরিয়াস মুখে উত্তর দিলÑ শুধু বলবে ভিভিয়ান রিচার্ডস, অ্যান্টিগা। ভিভিয়ান রিচার্ডস, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বললেও হবে!’
ক্লাইভ লয়েডের হাত থেকে আর্মব্যান্ড নিয়ে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত উইন্ডিজের অধিনায়ক ছিলেন ভিভ রিচার্ডস। কোনো সিরিজ হারেননি। নিজে ছিলেন কালজয়ী ব্যাটসম্যান। দলটাও পেয়েছিলেন তেমন। গর্ডন গ্রিনিজ ও ডেসমন্স হেইন্সের মতো দুই ওপেনার। এরপর তরুণ রিচি রিচার্ডসন ও কার্ল হুপার। ভিভ স্বয়ং নামতেন পাঁচে। গাস লসি ও জেফ ডুজন তারপর। বোলিংয়ে ছিলেন ওয়ালশ, অ্যামব্রোস, আগুনে মার্শাল আর উইনস্টন বেঞ্জামিন। কে হারাবে এই উইন্ডিজকে। এমন দলের অধিনায়ক ছিলেন বলেই হয়তো কিশোর ভিমানিকে ঠিকানায় নামের সঙ্গে দেশ জুড়ে নিতে বলেছিলেন ভিভ।
সেই সর্বজয়ী উইন্ডিজকেই কিনা এক সিরিজে হারিয়েই দিতে বসেছিল ইমরান খানের পাকিস্তান। ১৯৮৮ সালে তিন টেস্টের সিরিজ খেলতে ক্যারিবীয় সফরে গিয়েছিলেন ইমরানরা। উইন্ডিজকে হারানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে অবসর থেকে ফিরে আবার দলের নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ইমরান খান (বর্তমানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী)। আবদুল কাদিরের মতো লেগ স্পিনার, ওয়াসিম আকরামের মতো পেসার, জাভেদ মিয়াঁদাদের মতো ব্যাটসম্যান থাকলেও পাকিস্তান ছিল আন্ডারডগ। অথচ সেই দলটাই কালজয়ী উইন্ডিজকে হারিয়ে ইতিহাসই গড়ে ফেলেছিল প্রায়। গায়ানায় প্রথম টেস্ট জিতে এগিয়ে যায় পাকিস্তান। ত্রিনিদাদে দ্বিতীয় টেস্ট ড্র হওয়ায় ব্রিজটাউন টেস্ট হয়ে পড়ে সিরিজ নির্ধারণী।
২২ এপ্রিল শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৩০৯ করা পাকিস্তান ৩ রানের লিড পেয়েছিল। দ্বিতীয়বার পাকিস্তান ২৬২ রান করলে উইন্ডিজের সামনে টার্গেট দাঁড়ায় ২৬৬। তাড়া করতে নেমে উইন্ডিজ প্রায় হারতে হারতে আম্পায়ারের দাক্ষিণ্যে বেঁচে যায়। পরে কাদির অভিযোগ করেছিলেন, ‘ভিভ ও অ্যামব্রোসকে তুলে নিয়েছিল ওয়াসিম। আমি মার্শালের বিপক্ষে এলবিডব্লিউ পেয়েছিলাম। (উইন্ডিজের দুই) আম্পায়ার দেননি। উল্টো শেষের দিকে আম্পায়ার আমাকে নো ডাকেন। যা থেকে ছক্কা মেরে টেস্ট বের করে নেয় বেঞ্জামিন।’
৪০ করে অপরাজিত ছিলেন এই পেসার। অন্য প্রান্তে ডুজন ২৯ রানে অপরাজিত। উইন্ডিজের অষ্টম উইকেট পড়েছিল ২০৭ রানে। বেঞ্জামিন ও ডুজন নবম উইকেটে ৬১ রান তুলে জয় নিশ্চিত করেন। দুই ব্যাটসম্যানের বীরত্ব আর বাজে আম্পায়ারিং বাকি পথটুকু পার হতে সাহায্য করেছিল ক্যারিবিয়ানদের। আত্মজীবনীতে জাভেদ মিয়াঁদাদ লিখেছেন, ‘আমরা প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু আম্পায়ারের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বাজে সিদ্ধান্ত আমাদের কাছ থেকে ম্যাচটা ছিনিয়ে নেয়।’
ইমরান পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘চেয়েছিলাম উইন্ডিজকে তাদের মাঠে হারাতে। অবসর ভেঙে ফিরে আসার ওটাই ছিল কারণ। সিরিজটা আমরা ১-১ ড্র করি। কিন্তু নিরপেক্ষ আম্পায়ারিং হলে ২-০তে জিততাম। আমিই একমাত্র অধিনায়ক যে উইন্ডিজের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজ হারেনি কখনো। সব ড্র করেছিলাম।’
১৯৮৮ সালে উইন্ডিজ সফরে টেস্ট সিরিজ শুরু করেছিল পাকিস্তান জয় দিয়ে। জর্জটাউনে ইমরানের দল ৯ উইকেটে জেতার পর পোর্ট অব স্পেনে ড্র করে। এরপর ব্রিজটাউন থ্রিলার।
তবে কেবল আম্পায়ারের ব্যর্থতা ছাড়া ব্রিজটাউন টেস্টের অন্য উজ্জ্বলতাও আছে। পুরো সিরিজের প্রায় সমান শক্তিধর দুই দলের লড়াকু মনোভাবের বিজ্ঞাপন হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্রিজটাউন টেস্টের শেষ দিন। রিচি রিচার্ডসন বলেছিলেন, ‘প্রথম টেস্ট (জর্জটাউন) হারার পর আমি মোটেই অবাক হয়নি। দুটি সমান ভালো দলের একটা যদি ভালো না খেলে অন্যটা তো জিতে বেরিয়ে যাবেই। আমরা গায়ানাতে ভিভ ও মার্শালকে পাইনি। দুজনেই ইনজুরিতে ছিল।’
ব্রিজটাউনে ভিভ ৬৭ করেছিলেন। ৬টা হাফসেঞ্চুরির সেই টেস্টে ওটাই ছিল সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত। টার্গেটে খেলতে নেমে ৩৯ রানে আকরামের বলে বোল্ড হয়েছিলেন ভিভ। তার অ্যান্টিগান সতীর্থ রিচার্ডসন করেন ৬৪। তবে ব্রিজটাউনের থ্রিলার জয়ের নায়ক তিনি নন। নায়ক হয়ে যান ৪০ করা বেঞ্জামিন। আম্পায়ারের সব ভুল সত্ত্বেও আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা টেস্ট ম্যাচটি বল নয় ব্যাট হাতে জিতিয়েছিলেন।
শুধুই আম্পায়ারের বেনিফিট অব ডাউটে কি আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা থ্রিলার জেতা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনাকে বেঞ্জামিনের মন্তব্যটা পড়তে হবে, ‘যখন আমি ব্যাট করতে নামি, তখন খেলা নিয়ে ভাবিনি। সংকটময় মুহূর্তের কথাও মাথায় ছিল না। শুধু জানতাম আমায় নিজের খেলা খেলতে হবে। ইতিবাচক ছিলাম। নিজেকে বলেছিলাম মারার বল পেলে মারব। সিনিয়র হিসেবে ডুজনেরই দায়িত্ব নেওয়ার কথা। কিন্তু ও কিছুটা নার্ভাস ছিল। আমায় বলা হয়েছিল ডুজনকে স্ট্রাইক দেওয়ার জন্য, কিন্তু ও শর্ট নিতেই পারছিল না। অবিচ্ছিন্ন নবম উইকেটে যে ৬৭ রান উঠেছিল তার অধিকাংশই করেছিলাম আমি। জয়সূচক রানটি ছিল সবচেয়ে উত্তেজক। উইকেটকিপার (সেলিম ইউসুফ) কাদিরকে বলছিলÑ কাম অন, লেগব্রেক, গুগলি, ফ্লিপার। আমিও মনে মনে এটাই আওড়াতে থাকলাম। ধারণা করলাম গুগলি আসবে। ঠিক তাই। স্ট্রেট বাউন্ডারিতে বাইরে পাঠালাম। কাদির যদি ফ্লিপার দিত তাহলে বোকা হওয়ার চান্স ছিল। সৌভাগ্য আমার যে তা ঘটেনি।’
যা ঘটার তাই যদি ঘটে তবে আর থ্রিলার হবে কেন?
