কভিড-১৯ রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) ও কক্সবাজার মেডিকেল ছাড়া কোথাও করোনা যাচাইয়ে পরীক্ষাগার নেই। ফলে বিভাগের অন্য ১০টি জেলার মানুষের বাড়তি চাপে হিমশিম খাচ্ছে বিআইটিআইডি। আর যে সংখ্যক পরীক্ষা হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয় বলছেন চিকিৎসকরাই। এদিকে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) কিট, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), কিছু রি-এজেন্ট ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমতি পেলেই পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) পলমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) মেশিন এলেও রয়েছে কিছু জটিলতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সংকটের সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিআইটিআইডির তথ্যমতে, দুটি পিসিআর মেশিনে চলছে করোনার নমুনা পরীক্ষা। নমুনা পরীক্ষায় কাজ করছে মাত্র সাতজন। তাদের পক্ষে দৈনিক ১০০-১২০টির বেশি করোনা যাচাই পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ গত সোমবার ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করতে হয়েছে ১২৯টি। গড়ে ১০০টির বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে হয় বিআইটিআইডিতে। গত ২৫ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বিআইটিআইডির ল্যাবে ১ হাজার ৫৮০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে গত সোমবার পর্যন্ত ৭১ জন।
বিআইটিআইডির ল্যাব ইনচার্জ অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, ‘করোনার নমুনা পরীক্ষা করছি দুটি পিসিআর মেশিনের মাধমে। তবে আমাদের আরও জনবল প্রয়োজন, কেননা এখানে একজন ভাইরোলজিস্ট ও আটজন টেকনিশিয়ান আছেন। আমরা সকালে আসি, রাতে বের হই। তারপরও আক্ষেপ নেই। তবে বেশি পরীক্ষার জন্য বাকি দুটি ল্যাব শিগগিরই চালু করা প্রয়োজন এখনই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের টেকনিশিয়ানরা ল্যাবের কাজের পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণে স্যাম্পল কালেকশনের জন্য রোগীর বাসায় কিংবা হাসপাতালে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে কাজ করছি, তবে জনবল সংকটের সমাধান করা খুব প্রয়োজন।’
প্রস্তুত সিভাসু, অনুমতির অপেক্ষা : সিভাসু তাদের ল্যাবে করোনা পরীক্ষার যাবতীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে। তবে অনুমতির অপেক্ষায় শুরু করা যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটিতে আগে থেকেই পিসিআর মেশিন আছে ছয়টি, ল্যাব পরিচালনার জন্য টিমও প্রস্তুত।
এ বিষয়ে সিভাসু উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য পরিচালক ইতিমধ্যে পরিদর্শন করেছে। আমরাও প্রস্তুত। আমাদের প্রয়োজন এখন কিট, পিপিই এবং কিছু রি-এজেন্ট। এ তিনটি জিনিস হলেই আমরা প্রতিদিন ১০০ নমুনা পরীক্ষা করতে পারব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের অনুমোদন দিলেই এবং আনুষঙ্গিক জিনিস প্রদান করলেই নমুনা পরীক্ষায় যেতে পারব। আমাদের ছয়টি রিয়েল টাইম পিসিআর মেশিন রয়েছে ল্যাবে।’
তিনি আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, ‘আমি বুঝছি না কেন তারা দেরি করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তাদের ল্যাব ভয়ে দিচ্ছে না। সেখানে সিভাসু এবং আমাদের টিম এগিয়ে আসছি। এ ক্রান্তিলগ্নে আমরা যদি কিছু কাজ করে দিতে পারি, এটাই আমাদের আত্মতুষ্টি। ল্যাব বাড়লে শনাক্ত হওয়া রোগীরা আইসোলেশনে গেলে সংক্রমণ কমতে থাকবে। যত বেশি টেস্ট, তত রোগী শনাক্ত হবে, আক্রান্ত কমতে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশাবাদী শিগগিরই অনুমতি মিলবে। আর প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেলেই আমরা দেশের কাজে নিয়োজিত হতে পারব।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে সিভাসুতে করোনা পরীক্ষা শুরু হবে। তাদের মেশিনপত্র সব আছে, তারা কিছু রি-এজেন্ট ও পরীক্ষাসংশ্লিষ্টর সামগ্রী এবং পিপিই চেয়েছেন। এসব আমি অধিদপ্তরে জানিয়েছি। তাদের সব ঠিক আছে। তবে যে সক্ষমতা প্রয়োজন গাইডলাইন অনুযায়ী তা অর্জন করতে হয়তো সময় লাগবে, ওগুলো টেকনিক্যাল বিষয়। অচিরেই এসব বিষয় সমাধান হয়ে যাবে। আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে সিভাসুর ল্যাবে পরীক্ষা শুরু হবে।’
চমেকে এসেছে পিসিআর মেশিন, তবে পরীক্ষায় দেরি হবে : চমেকে পিসিআর মেশিন পৌঁছলেও পরীক্ষা কখন শুরু হবে, তা নিয়ে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত পিসিআর মেশিন স্থাপন হয়নি। এছাড়া একটি জীবাণুমুক্তকরণ মেশিন প্রয়োজন, যা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করবে কয়েক দিনের মধ্যে।
চমেকের অধ্যক্ষ ডা. শামীম হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিসিআর মেশিন বসানোর লোকজন এসেছে আজ (গতকাল)। কিন্তু তারা জানিয়েছেন বুধবার (আজ) মেশিনের প্যাকেট খুলবে। বুধবার থেকেই কাজ শুরু করবে। তখন বলতে পারব কী আছে, কী সংকট আর কী প্রয়োজন। ঢাকা থেকে ২৫ প্যাকেটে যন্ত্রপাতি এসেছে। এসব স্থাপন হলে নমুনা পরীক্ষা শুরু হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ল্যাবে একটি জীবাণুমক্তকরণ মেশিন, যা অটোক্ল্যাব নামে পরিচিত। এটি আমরা সংগ্রহ করে নিচ্ছি। কারণ এটি খুব প্রয়োজন। এছাড়া মঙ্গলবার রাতেই কিট চলে আসার কথা। তাই সব মিলিয়ে এ সপ্তাহ সময় লাগবে পরীক্ষা শুরু করতে।’
জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সিভাসুতে প্রায় প্রস্তুত এখন তাদের যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা কার্যক্রম চালুর অনুমতি দিয়ে দেওয়া উচিত। কেননা এখন বেশি পরীক্ষার প্রয়োজন। চমেকে মেশিন যত দ্রুত সম্ভব স্থাপন করতে হবে। বিআইটিআইডির সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার।
