হানিফ মোহাম্মদদের পিরামিড দর্শন

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২০, ০১:৩৭ এএম

কারণ জানলে হয়তো পিরামিডে ঘুমিয়ে থাকা মমিও খিলখিল করে হেসে উঠত। ক্রিকেট ম্যাচ অসমাপ্ত রেখে হানিফ মোহাম্মদের মতো কিংবদন্তি পিরামিড দেখতে ছুটেছিলেন! এই দিনেই ঘটেছিল সেই ঘটনা। ১৯৫৪ সালের ২৩ এপ্রিল।

মিসরে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল পাকিস্তান দল। তাও আবার যেমন-তেমন দল নয়। আব্দুল হাফিজ কারদারের নেতৃত্বে হানিফ মোহাম্মদের সঙ্গে ছিলেন ওয়াজির মোহাম্মদ, খালিদ হাসান, ফজল মাহমুদের মতো তারকারা। কায়রো যাওয়ার কিছুদিন আগেই পাকিস্তান দলটা লাখনৌ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে এহেন পাকিস্তান দলের ক্রিকেট খেলার জন্য মিসর যাওয়ার দরকার পড়ল কেন?

দরকারে নয় কিছুটা শখের বশে, বাকিটা অনুরোধে কায়রো গিয়েছিল পাকিস্তান। ম্যাচটা হয়েছিল গিজিরা স্পোর্টিং ক্লাবে। যারা ইতিহাসের খোঁজ রাখেন তাদের বলতে হবে না যে, গিজা কেন বিখ্যাত। নীলনদের পাশে এই শহরেই পৃথিবীর সুরক্ষিত বিস্ময় পিরামিডের অবস্থান। আছে স্ফিংসও। এই জোড়া বিস্ময়ের হাতছানিতেই ক্রিকেট ম্যাচ অসমাপ্ত রেখে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন হানিফ মোহাম্মদরা। সেই গল্প বলার আগে মিসরের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে একবার নজর ফেলা যাক।

অটোমানরা যে ক্রিকেট খেলতেন না তা না বললেও চলে। আক্রমণের সময় রোমানরাও ক্রিকেট খেলা সঙ্গে নিয়ে আসেননি, কারণ তারা এটা জানতেনই না। আলেকজান্দ্রিয়ায় ক্রিকেট প্রথম এসেছিল ইংরেজদের হাত ধরে। সেটাও প্রায় তিনশ বছর আগে। মিসরে প্রথম ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিষ্ঠা ১৮৫১ সালে। খেলাটা সাধারণত ব্রিটিশ আর্মিরাই খেলতেন। সাধারণের মাঝে ক্রিকেটের তেমন চল ছিল না। আস্তে আস্তে সুইজ ক্যানাল কাটা হলো। ইংরেজদের ক্ষমতা ও সংখ্যা বাড়তে থাকল আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা। ১৯০৯ সালের দিকে মিসরের ব্রিটিশ জনগণের প্রধান খেলা ছিল ক্রিকেট। এই সময় থেকেই মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) দল পাঠানো শুরু করে দেশটিতে। উল্টোটাও হয়েছে। সুদান ও মিসরের যৌথ দল এমসিসির সঙ্গে খেলেছে লর্ডসেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মিসরীয় ক্রিকেট জৌলুশ হারাতে শুরু করে। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

নীলনদের দেশে ক্রিকেট যখন ক্ষয়িষ্ণু সেই সময় পাকিস্তান খেলতে গিয়েছিল গিজিরা স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে। এটাই ছিল উপমহাদেশের বাইরে হানিফ মোহাম্মদদের প্রথম বিদেশ সফর। মিসর থেকে ইংল্যান্ডে টেস্ট খেলতে গিয়েছিলেন তারা। ফিরেছিলেন দারুণ এক সুখস্মৃতি নিয়ে। ওভালে ২৪ রানে জিতেছিল পাকিস্তান। সেই টেস্টে ফজল মাহমুদ দুই ইনিংসে ৯৯ রান দিয়ে ১২ উাইকেট (৬/৫৩ ও ৬/৪৬) নিয়েছিলেন। ওই টেস্ট জিতে সিরিজে সমতা এনেছিল পাকিস্তান।

হানিফ মোহাম্মদরা কায়রো গিয়েছিলেন ইংল্যান্ড সফরের আগে। হয়তো গিজিরার একদিনের ম্যাচটার সঙ্গে কিছুটা প্রস্তুতির ব্যাপারও জড়িয়ে ছিল। তবে যে মনোভাব নিয়ে খেলেছিল পাকিস্তান দল তাতে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান হওয়ারও যথেষ্ট কারণ আছে। ম্যাচ ফেলে রেখে পিরামিড দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা কি আগে থেকেই করে রেখেছিলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা?

পাকিস্তানের তুলনায় গিজিরা দলটি ছিল নিতান্তই এলেবেলে। তাই কেউ প্রতিদ্বন্দিতা আশাও করেনি। একমাত্র রিচার্ডস স্টানবুরি ছাড়া দলে ভালো কোনো ক্রিকেটার ছিল না। ইংরেজ ভদ্রলোকের জন্ম ভারতে। ছোটবেলা কেটেছিল মাদ্রাজে। আট বছর বয়সে পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর ইংল্যান্ড। বড় হয়েছেন কেমব্রিজে। ১৯৩০ সালের দিকে সমারসেটের উইকেটরক্ষক হিসেবে কাউন্টি খেলেছেন। ১৯৫০ সালে ডিস্ট্রিক্ট কমিশনারের চাকরি নিয়ে কায়রো গিয়েছিলেন। প্রথম আরবিতে কায়রোতে পা রাখার পর গণবিক্ষোভের মুখে পড়েন। আরবি জানায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে জনপ্রিয়ও হন। এই স্টানবুরির উদ্যোগেই পাকিস্তান খেলতে গিয়েছিল কায়রোতে।  

পাকিস্তানের বিপক্ষে গিজিরা স্পোর্টিং ক্লাব দলটি তৈরি হয়েছিল ১৫ জনে। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। পাকিস্তান এগারোজন নিয়ে খেললেও শক্তির ভারসাম্য আনতে ১৫ জন নিয়ে খেলেছিল স্বাগতিকরা। প্রথমে ব্যাট করেছিল পাকিস্তান। মারমার কাটকাট ভঙ্গিতে শুরু করেন হানিফ ও আলিমুদ্দিন। প্রথমজন ৩৭ করে আউট হন। দ্বিতীয় জন ৫২ করে নেন স্বেচ্ছা অবসর। এরপর ইমতিয়াজ (১৪) ও মাকসুদ আহমেদ (২৫) দলকে টেনে নেন। পরে ইব্রাহিম ঘাজলির অপরাজিত ৫২ রানে ৪৫ ওভারে ৪ উইকেটে ২১৮ রানে পৌঁছায় পাকিস্তান। অধিনায়ক কারদার ইনিংস ঘোষণা করেন। যদিও আরও ব্যাট করার সুযোগ ছিল। কিন্তু গিজার পিরামিড আর স্ফিংসের বিস্ময় দেখার জন্য মনে মনে উতলা হয়ে উঠেছিল পাকিস্তান দল। তারা ভেবেছিল ফজল মাহমুদের গতির মুখে কায়রোর ক্লাবটি দাঁড়াতে পারবে না। প্রত্যাশা মতো তিনি ২৮ রানে ৭ উইকেটও নিয়েছিলেন। কিন্তু একপ্রান্তে বুড়ো স্টানবুরি অটল দাঁড়িয়ে যান। জেতার জন্য পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৪ উইকেট। তারা ফেলতে পেরেছিল ১৩টি। কায়রোর ক্লাবটি ২৫ ওভারে করেছিল ৫২ রান। এই অবস্থায় ম্যাচ অসমাপ্ত রেখে পিরামিড দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। ম্যাচের ভাগ্যে তাই ড্র লেখা হয়ে যায়।

ভাগ্যিস ব্যাপারটা ঘটেছিল ১৯৫৪ সালের ২৩ এপ্রিল। এখনকার যুগে কোনো টেস্ট দল এমন কা- করলে সেদেশের মিডিয়া তাজা খেয়ে ফেলত। পিরামিড দেখার অপার কৌতূহলের দুর্মর আগ্রহের ব্যাপারটা তারা কল্পনাতেও রাখত না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত