কর্মহীনরা জড়াচ্ছে অপরাধে

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৪:০১ এএম

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটিতে কার্যত ‘লকডাউনে’ সারা দেশ। এই সুযোগে অপরাধীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম। প্রকাশ্যে ডাকাতি, ফাঁকা ফ্ল্যাটে সিঁধেল চুরি (গ্রিল বা তালা ভেঙে চুরি), নেশার টাকার জন্য খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে। এর অনেক খবরই থানায় আসছে না এখনো। পুলিশের ভাষ্য, আগে থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের পাশাপাশি করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়াদের অনেকে জড়াচ্ছে চুরি, ডাকাতি বা প্রতারণার মতো ঘটনায়।  

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, অবিলম্বে সমন্বিত ব্যবস্থা না নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পাশাপাশি অনেকেই অভাবে পড়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে।

নাম প্রকাশ না করে ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৫ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার প্রথম দিকে রাজধানীর অনেকেই বাসায় তালা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। সেসব বাসাকে টার্গেট করছে সিঁধেল চোরেরা। কিছু বাসায় চুরির তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। যারা গ্রামের বাড়িতে গেছে, তারা এখনো জানে না যে তাদের বাসার কী অবস্থা। যখন ঢাকা ফিরবে তখন বোঝা যাবে কী পরিমাণ চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ফুটপাতে লোকের রাত যাপন বৃদ্ধি পেয়েছে। এদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। রাত হলেই ছিনতাই, খুন থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধ করছে এরা।

পুলিশের তথ্য মতে, গত ৩১ মার্চ ভোরে রাজধানীর কলাবাগান থানার সেন্ট্রাল রোডের একটি ফ্ল্যাটে গ্রিল কেটে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও ল্যাপটপ চুরি করে অজ্ঞাতনামা চোরচক্র। ১ এপ্রিল রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটে বিল্লাহ ফার্মায় ও ৫ এপ্রিল রাতে খিলগাঁওয়ের লাজ ফার্মায় একই কায়দায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। তারা প্রথমে একটি পিকআপে করে মুখে মাস্ক ও গামছা পেঁচিয়ে আসে। ফার্মায় গিয়ে চাপাতি, দা ও লোহার রডের ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা, মোবাইল ও ল্যাপটপ নিয়ে যায়। ৭ এপ্রিল ভোরে মগবাজারের আউটার সার্কুলার রোডে রানা নামের এক ছিন্নমূল ব্যক্তিকে গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এমন আরও ঘটনাই ঘটছে। ১৫ এপ্রিল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পশ্চিম আগারগাঁওয়ে নির্মাণাধীন একটি ১০তলা ভবনের ৮তলা থেকে পা বাঁধা অবস্থায় ওই ভবনের কেয়ারটেকার মো. আনোয়ার হোসেনের (৫৫) মরদেহ উদ্ধার করে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানতে পারে ভবনের নির্মাণশ্রমিকরাই তাকে খুন করেছে। ১৬ এপ্রিল বিকেলে ছিন্নমূল মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণের আশ্বাস দিয়ে রাজধানীর বাড্ডার দক্ষিণ আনন্দনগর এলাকায় টাকা আদায় করার সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় একটি প্রতারক চক্রের ছয় সদস্য। ১৭ এপ্রিল গাজীপুরের টঙ্গীতে সরকারি অনুদানের নামে প্রতারণাকালে দুই প্রতারককে আটক করে পুলিশ। ১৯ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের সামনে ‘ভাইরাস শাট আউট’ নামের একটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর প্রোডাক্ট বিক্রির সময় টিপু সুলতান (৩৫) নামে এক প্রতারককে রমনা মডেল থানা-পুলিশের সহায়তায় আটক করে ভোক্তা অধিকার আইনের ৪৪ ধারায় ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহনাজ হোসেন ফারিবা। ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির প্রতিবন্ধী ই-লার্নিং সেন্টার থেকে ১৪টি কম্পিউটার চুরির ঘটনা ঘটেছে।  সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার আবদার এলাকায় ফ্ল্যাট বাড়ির দ্বিতীয় তলায় মাসহ একই পরিবারের চারজনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এসব ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘কোয়ারেন্টাইন যদি দীর্ঘ হয়, তবে ব্যক্তির ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক প্রেশার পড়বে। ফলে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পাশাপাশি অনেক অপেশাদারও বিভিন্নভাবে অপরাধ করার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করবে। পেটের দায়ে একধরনের লোক অপরাধ করবে, আবার সংঘবদ্ধ অপরাধীরা অপরাধের সুযোগ পাবে। অপরাধের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করবে তারা। ফলে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। সমাজের সচেতন মহল তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করলে সরকারের একার পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক স্থানে পিপিই, মাস্ক পরে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সব থেকে বেশি। তাদের সোর্স আছে, তারা জানে কোথায় কোন এলাকায় অপরাধী আছে। ফলে আমার মনে হয় তারা এটাকে সহজে উপড়ে ফেলতে পারে। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটা বড় দায়িত্ব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে যাওয়া।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপির রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘করোনার সুযোগে ফুটপাতে রাত যাপনকারী লোক বেড়ে গেছে। এতে অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি মগবাজার এলাকায় ফুটপাতে একটি খুনের ঘটনাও ঘটেছে। কিছু লোক সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করছে। সিনিয়র স্যারদের সঙ্গে কথা বলে অবিলম্বে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের প্রতারক এবং অপরাধীদের বিষয়ে আমরা সর্বদা জনগণকে সচেতন ও সাবধান থাকতে বলছি। যেকোনো সন্দেহে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে অথবা ৯৯৯-এ কল করতে আমরা জনগণকে পরামর্শ দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা বলছি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে।’

তিনি বলেন, ‘করোনার বর্তমান অবস্থায় কিছু বিশেষ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সচেতন রয়েছে এবং সব ধরনের অপরাধের হার কমাতে কাজ করে যাচ্ছে।’

এর আগে গত বুধবার বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রান্তিক মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানান পুলিশ সদস্যদের প্রতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত