এবার এই মহামারীর মুখোমুখি হতে গিয়ে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাত যে কত অবহেলিত, তা অনেকটা দৃশ্যমান হলো। আমি জানি এই একটি লাইন পড়ে কেউ কেউ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন। বলবেন, এই করোনা-যুদ্ধের মোকাবিলা করতে গিয়ে উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও তো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আমি তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলব। এসব তর্ক ও বিচার-বিশ্লেষণে আমি যেতে চাচ্ছি না। আমি আমার দেশের বাস্তবতাটি দেখতে চাইছি। উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটা দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতটা সুরক্ষিত থাকার কথা, আমাদের দেশ পরিচালকরা সেদিকে ততটা মনোযোগ দিতে পারেননি। এদিকে সঠিক পরিকল্পনাহীনতা, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির কড়াল থাবার বিষয়গুলো স্পষ্ট হচ্ছে। এ দেশের ডাক্তারদের একাংশের ক্ষেত্রেও জনমনে এক ধরনের হতাশা রয়েছে। তবে নীতিবর্জিত ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির ডাক্তার থাকলেও দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানবিক ডাক্তারের সংখ্যাই বেশি। এই করোনা-সংকটে জীবন বাজি রেখে কত ডাক্তার-নার্স সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে একজন করোনা আক্রান্ত হয়েও মৃত্যুকে বরণ করেছেন। সাধারণ সময়ে ডাক্তারদের সেবা নিয়ে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন ওঠে। বিস্তর উদাহরণও আছে। এ দেশের অনেক ডাক্তারের দেওয়া সিদ্ধান্তে জটিল রোগাক্রান্ত বিপন্ন মানুষ প্রতিবেশী দেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেখা যায় ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। অথবা বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্টে ধরা পড়ছে ভুল। এখন এই সংকটের মুখে এসে স্পষ্ট হচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তার নন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মধ্যেই রয়েছে সংকট। হাসপাতালগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য সেবা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে আমি প্রায় তিন বছর গবেষণার কারণে কলকাতায় ছিলাম। তখন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। আমি রোগী নিয়ে অনেক ডাক্তারের চেম্বার ও হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছি। ফলে কিছুটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। কলকাতাতেও বণিক মানসিকতার ডাক্তারের সংখ্যা কম নয়। সেখানে চিকিৎসার ব্যাপারে আমি পরামর্শ ও সহযোগিতা নিতাম কলকাতায় আমাদের সিনিয়র বন্ধু প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। অসম্ভব ভালোমনের এই সংস্কৃতিবান মানুষটির জন্মই হয়েছে বোধ হয় মানুষের সমস্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।
একবার প্রাণতোষদা প্রশ্ন করলেন, ‘দেখুন আপনাদের দেশে এখন অনেক প্রথিতযশা ডাক্তার আছেন। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি অনেক বড় বেসরকারি হাসপাতালও হয়েছে। তাহলে শুধু কলকাতেই বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ মানুষ চিকিৎসার জন্য আসে কেন?’ সেদিন এই প্রবীণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারিনি। এখন করোনা-যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি। হাসপাতালগুলো অব্যবস্থাপনা, অপ্রতুল চিকিৎসা সরঞ্জাম ও দুর্নীতি যেভাবে অন্ধকারের পথনির্দেশ করছে, তাতে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এ দেশের চিকিৎসা নিয়ে কেন মানুষের মনে এত হতাশা! বুঝলাম, করোনা গ্রাসের মতো এমন দুর্বিপাকের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি সারা বিশ্বের মতো আমাদেরও ছিল না। যদিও সরকার বা বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা প্রায় প্রতিদিনের ব্রিফিংকালে জানাতে চেষ্টা করেন যে, ‘আগে থেকে প্রস্তুতি থাকায় বাংলাদেশে সংকট এত গভীর হয়নি’। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি তেমন ছিল? ডিসেম্বরের শেষে চীন থেকে যখন নতুন বিপদের কথা এলো, তখনো তো আমাদের শীতঘুম ছিল। জানুয়ারির মধ্যে ইউরোপের নানা দেশে করোনা আক্রমণ শুরু হলেও আমরা গা করিনি। তাই সবাই হায় হায় করলেও নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করে যাওয়ার সাহস দেখায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের জানার কথা তাদের নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলোর কতটুকু সামর্থ্য আছে। তারপরও দায়িত্বশীলরা উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে ছিলেন। অর্থাৎ এই তথ্য মিডিয়ার যুগে সারা পৃথিবী হাতের মুঠোতে থাকার পরও দূরদর্শিতা দিয়ে ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। যখন বাংলাদেশে করোনার আঘাত দৃশ্যমান হতে থাকে, তারপর থেকে নড়েচড়ে বসতে দেখা যায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারকে। অর্থাৎ মার্চের আগে তেমন প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। উন্নত দেশগুলো যার যার সংকট নিয়ে ঘর্মাক্ত। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখাতে করোনা মোকাবিলায় আন্তরিকতার সঙ্গে ছোটাছুটি করলেও এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য বিভাগের যে পূর্ব প্রস্তুতি ছিল, এমন দাবি করা যায় না।
গত ২২ এপ্রিল এক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেল, দেশে করোনা চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট ১৭টি হাসপাতাল এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সেখানে যে তথ্য আছে তা হতাশাব্যঞ্জক। এই ১৭টির বাইরেও সারা দেশের হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট। চলমান অন্যতম বড় সংকট এখন প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। তা হচ্ছে চিকিৎসক-নার্স সংকট। দীর্ঘদিন থেকে বলা হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্সের পদপূরণ ও জনসংখ্যা অনুপাতে নতুন পদ সৃষ্টি জরুরি কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। আজ দেখা যাচ্ছে উল্লিখিত ১৭টি হাসপাতাল যন্ত্রপাতিতে সাজালেও প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাবে সঠিকভাবে সেবাদান সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যতই দাবি করেন চিকিৎসক ও সেবক-সেবিকাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী রয়েছে কিন্তু বাস্তবে এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে দুঃখজনক ঘটনা ঘটল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিটফোর্ড হাসপাতালে। করোনা উপসর্গ লুকিয়ে আসা এক সন্তানসম্ভাববা নারীর অপারেশন করতে গিয়ে হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক ও নার্সের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। অবশ্য আমরা জানি না এই সংকটটি কেন হলো। এটি কি সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে, না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অসতর্কতার জন্য। এই মহামারীকালে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সব যোদ্ধার ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পরেই সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার কথা। তাহলে অরক্ষিতভাবে এত চিকিৎসক-নার্স হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করলেন কেন! আমি সংশ্লিষ্ট আক্রান্তদের আশু রোগমুক্তি কামনা করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য অনুরোধ করব। হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ যা আছে, তা কার্যকর করার আনুষঙ্গিক জরুরি যন্ত্রপাতির অভাব আরও প্রকট। দেখা যাচ্ছে, ১৭টি হাসপাতালে ১৮৩টি ভেন্টিলেটর মেশিন স্থাপন করা হলেও ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আইসিইউ বেডের ঘাটতি রয়েছে ৫০টি। তা ছাড়া রোগী মনিটর ঘাটতি রয়েছে ৯০টি, পালস অক্সিমেটর ৩৪টি, এজিবি মেশিন উইথ গ্লুকোজ অ্যান্ড ল্যাকটেড ঘাটতি রয়েছে ১৭টি, ডিফেব্রিলেটর এক্সটারনাল ঘাটতি রয়েছে ২৮টি। এ ছাড়া এসব ভেন্টিলেটর কার্যকর করতে ১২১ চ্যানেলের ইসিজি মেশিন প্রয়োজন ৩০টি, পোর্টেবল ভেন্টিলেটর দরকার ৩৪টি। এসব আইসিইউর তাপমাত্রা ঠিক রাখতে পাঁচ টনের এসি দরকার ৩০টি, ডিহিউমিডিফায়ার ২৫ এল দরকার ৩০টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার দরকার ৮৫টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘাটতি রেখে রোগীর নিবিড় পরিচর্যা কঠিন।
আমরা আশা করছি হয়তো সহসাই এসবের সংস্থান করা হবে। তবে উল্লিখিত বাস্তবতা বুঝিয়ে দিল আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্বলতা কতটা ছিল। বাস্তবতা দেখে এখন তো সাধারণ মানুষের মধ্যে আরেক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। করোনা চিকিৎসার সূত্রে অন্য রোগীদের প্রতি নাকি ভালো দৃষ্টি দিতে পারছে না হাসপাতালগুলো। সূচনার কথায় ফিরে আসি। মানুষ চিকিৎসার জন্য কেন ছুটছে দেশের বাইরে? এর মধ্যে বড় কারণ হচ্ছে দেশের চিকিৎসায় আস্থাহীনতা। আমাদের দেশে অনেক দায়িত্বশীল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও একশ্রেণির ডাক্তারের অতি-বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রায়ই চিকিৎসায় আশ্বস্ত হতে পারছে না রোগী। ভারতে বা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করতে গিয়ে দেশের ডাক্তারদের অনেক সিদ্ধান্তই ভুল ছিল প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আমার এক নিকট আত্মীয় অভিজ্ঞ ডাক্তার। ও প্রায়ই বলে থাকেন, যত নাম-ডাকের ডাক্তারই থাক আপনারা তাদের কাছে কম যাবেন, যারা চেম্বারে প্রচুর রোগী দেখেন, সংগত কারণেই কম সময় দেন। যাবেন ডিগ্রিধারী তেমন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে, যাদের নাম-ডাক তেমন না ছড়ালেও কম রোগী দেখেন ও সময় নিয়ে দেখেন। আমার কলকাতার অভিজ্ঞতা তেমনই ছিল। দ্বিতীয় সংকট হচ্ছে, আমাদের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার-নার্স ও চিকিৎসা উপকরণের অভাব। কমার্শিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অভাব নেই এ দেশে। ফলে মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। ধনীদের জন্য বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালও অনেক হয়েছে। কিন্তু এই করোনা-সংকটে প্রকাশিত হচ্ছে যে, এসব হাসপাতালেও চিকিৎসা উপকরণের ঘাটতি অনেক। আর সে কারণে এ দেশের সামর্থ্যবান ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও আমলারা গৌরিসেনের টাকার বদৌলতে সামান্য হাঁচি-কাশি, জ্বরেও সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ছোটেন। আমাদের ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের নিয়ে একটি কৌতুক আছেÑ তারা বলেন ও সাইনবোর্ড টানিয়েও প্রচার করেন, তারা দেশেই চিকিৎসা করানোর শপথ নিয়েছেন। কিন্তু কার্যত তাদের বিদেশেই চিকিৎসা করতে দেখা যায়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ কোনো সরকারের সময়েই চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়নের তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রও তৈরি হয়েছে কিন্তু ব্যবস্থাপনার জায়গাটিতে দুর্বলতা রয়েছে। এখন টের পাচ্ছি ডাক্তার-নার্স ও চিকিৎসা উপকরণের অভাব কতটা প্রকট।
আমরা প্রত্যাশা করি করোনাকাল শিগগিরই অতিক্রম করব। তবে এই দুর্যোগে চিকিৎসাব্যবস্থার যে দুর্বলতা দেখিয়ে দিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই যাতে সংশ্লিষ্ট বিধায়করা গ্রহণ করেন।
লেখক
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7 b@gmail. com
