শুক্রবার দুপুর ১টায় রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন সিপাহীবাগ টেম্পুস্ট্যান্ড এলাকার চারদিকে মানুষ আর মানুষ। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। কেউ দোকানে কেনাকাটা করছে, কেউ দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ আবার চা-সিগারেট খাচ্ছে। অধিকাংশের মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। অথচ করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে এলাকাটিতে ‘লকডাউন’ চলছে। সোয়া ১টার দিকে সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি এলাকায় গিয়ে অপ্রয়োজনে রাস্তায় ঘোরাফেরা না করার জন্য মাইকিং করে। সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে কিছু মানুষ রাস্তা থেকে সরে যায়। সেনাবাহিনী চলে যেতে আবার যেই সেই অবস্থা।
স্থানীয় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আলতাফ হোসেন হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেখেন এত মানুষ সবাই কী প্রয়োজনে বের হয়েছে? একে অন্যের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াচ্ছে, হাঁটছে। কারও কারও মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। করোনায় আমরা মরব না তো কারা মরব।’ সরেজমিন ঘুরে সিপাহীবাগ টেম্পুস্ট্যান্ডের মতো একই অবস্থা দেখা গেছে খিলগাঁও রেলগেট, তিলপাপাড়া, খিলগাঁও কাঁচাবাজার, মাদারটেক এলাকায়ও। তবে যখনই পুলিশ বা সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখছে লোকজন সরে পড়ছে। পুলিশ বা সেনাসদস্যরা সরে যেতেই আবার রাস্তায় আসছে।
পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পরই দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন ‘ঘরে থাকবেন, না-কি কবরে থাকবেন’ আপনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব অর্থাৎ ঘরে থাকার বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করে তিনি বলেন, সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নাগরিক দায়িত্ব। এটি বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বলপ্রয়োগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে, পরিবারকে ও দেশকে রক্ষার স্বার্থে নিজেদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এ কথা বলা সত্ত্বেও অনেকেই তা লঙ্ঘন করছেন। এখন বলব, আপনি ঘরে থাকবেন, না-কি কবরে যাবেন, এই সিদ্ধান্তটা আপনার। সবাই ঘরে থাকবেন আর কেউ কেউ বাইরে থাকবেন এটা হতে দেওয়া হবে না।’ ন্যূনতম প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া, অনর্থক ঘোরাঘুরি থেকে সবাইকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানান তিনি।
পুলিশ বা সরকারের পক্ষ থেকে যতই নির্দেশনা দেওয়া হোক, কিছু মানুষ কোনোভাবেই সেগুলো মানছে না। অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করায় ও ঘরের বাইরে থাকার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত রাজধানীতে চলছে মোবাইল কোর্ট। নাগরিকদের করা হচ্ছে জরিমানা। দেওয়া হচ্ছে কান ধরে উঠবস করাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ এসবে কোনো কথাই শুনছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে খিলগাঁও কাঁচাবাজার সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ত্রাণ দেওয়া হয়। সেখানে ত্রাণের জন্য শত শত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি কেউ মানছে না। সাড়ে ১২টার দিকে খিলগাঁও তালতলা এলাকায় খোলাবাজারে টিসিবির একটি ট্রাক ঘিরেও দেখা গেছে অসংখ্য মানুষের ভিড়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রাজধানীর গুলশান, ধানমণ্ডি, বনানী, মহাখালী, নয়াপল্টন, সেগুবাগিচাসহ কিছু এলাকায় মানুষ অপ্রয়োজনে খুবই কম বের হচ্ছে। তার তুলনায় খিলগাঁও, মাদারটেক, মান্ডা, নন্দীপাড়া, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, জুরাইন, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, হাজারীবাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাড্ডার কিছু এলাকায় মানুষ অপ্রয়োজনে রাস্তায় ঘুরছে।
শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে মৌচাক ও কাকরাইল এলাকায় দেখা গেছে, রাস্তায় প্রচুর প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল চলছে। রিকশাও ছিল অনেক। মৌচাকে ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন পাঁচ তরুণ। জানতে চাইলে তারা বলেন, মৌচাক মার্কেটের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী তারা। মার্কেট ও দোকান বন্ধ, কারও সঙ্গে দেখা হয় না, তাই মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সবাই এক জায়গায় হয়েছেন।
মৌচাক মোড়ের পশ্চিম পাশের রাস্তায় একটি ট্রাক থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছিল। সেখানে প্রায় শ’খানে মানুষের লাইন। একজন আরেকজনের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। দূরত্ব বজায় রাখার কথা বললে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন ক্ষুব্ধ হলেন। একজন জানালেন, আধাঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, করোনায় আমাদের কিছু হবে না। এসব বড় লোকদের জন্য। আগে বাঁচার জন্য তেল-ডাল কিনতে হবে।
মগবাজার মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল হক বকুল বলেন, ওয়্যারলেস থেকে মধুবাগের সড়কে প্রতিদিনই মানুষের ভিড় থাকছে। ওয়্যারলেস থেকে গ্রিনওয়ে গলির প্রবেশমুখ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ভ্যানে করে অস্থায়ী বাজার বসানো হয়েছে। মাছ, ডিম, সবজি, ফল সবই পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মানুষ কেনাকাটা করে। সবজি বিক্রেতা বলেন, কাস্টমারকে বলি দূরে দূরে থাকতে। তারা খালি গায়ে গা লাগিয়ে মাল বাছাবাছি করেন। নিষেধ করলেও শোনেন না।
বাসাবোর বাসিন্দা রাশেদ নিজাম বলেন, বাসাবো খেলার মাঠে সামাজিক দূরত্ব মেনে কাঁচাবাজার বসানো হয়েছে। বিষয়টি তদারকি করছে পুলিশ। এরপরও বিভিন্ন গলি ও মহল্লায় মানুষকে অপ্রয়োজনে ভিড় জমাতে দেখা যায়।
নগরীতে মানুষজনের অপ্রয়োজনে বের হওয়া ও আড্ডা দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি অপ্রয়োজনে রাস্তায় নয়। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। এরপরও অনেকে সেটা মানছে না। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে অকারণে ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে ডিএমপি রাজধানীজুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। প্রতিদিনই ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মামলা ও জরিমানা করছেন। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে আইন প্রয়োগ করে তাদের ঘরে রাখা সম্ভব নয়।’
