উপসর্গহীনদের জন্য পুল টেস্টের প্রস্তাব

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ১২:০২ এএম

নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। আর এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সংক্রমিত এলাকাগুলোতে জনসাধারণের জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এখন আর স্পর্শকাতর বলে কোনো জেলা/এলাকা নেই। সবই ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষা আর সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া করোনাভাইরাস সম্পূর্ণ মুক্ত করা সম্ভব নয়। সীমান্ত বলতে আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং হট পট বা করোনায় বেশি আক্রান্ত এলাকা দুটোই। সীমান্তে চেকিংয়ের মতোই এলাকাভিত্তিক যাতায়াতও বন্ধ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগুলো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভাইরোলজিস্টদের মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে। কোনোক্রমেই অনুমাননির্ভর হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। উপসর্গ যাদের আছে, তাদের জন্য বাছবিচার না করে ‘র‌্যান্ডম টেস্ট’ করতে হবে। আর খরচ ও সময় বাঁচাতে একাধিক স্যাম্পল নিয়ে ‘পুল টেস্ট’ করা যেতে পারে। টেস্টের কোনো বিকল্প নেই। তাই দ্রুততম সময়ে বেশির ভাগ নাগরিকের টেস্ট সম্পন্ন করতে একই সঙ্গে এ দুই রকম টেস্ট পরিচালনা করা যায়।

করোনাভাইরাসের লক্ষণ হচ্ছে, জ্বর, সর্দি বা শ্বাসকষ্ট। তিন দিন পর শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যায়। তবে এমন কোনো উপসর্গ না নিয়েও অনেক পজিটিভ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এমনকি গলা ব্যথাও নেই। এগুলোকে উপসর্গবিহীন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলা হচ্ছে। আপাতভাবে দেখা যাচ্ছে পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যক্তির শরীরেই ঘাঁটি গেড়েছে নোভেল করোনাভাইরাস। এই উপসর্গহীন কভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে বিভিন্ন দেশেই। চীনে ধরা পড়ছে। ভারতের কর্ণাটকে মোট আক্রান্তের ৬০ শতাংশই উপসর্গহীন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। আমাদের আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও অনেকটা মিলও আছে। তাই উপসর্গবিহীন করোনা রোগীর প্রবণতা আমাদেরও চিন্তা বাড়াচ্ছে। তাই ‘পুল টেস্টে’র মতো সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য ভালো হবে বলে মনে করি।

‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)’ একটি কার্যকর স্ক্রিনিং বা কভিড আক্রান্তদের চিহ্নিত করার পদ্ধতি হিসেবে ‘পুল টেস্ট’-এর পরামর্শ দিয়েছে। বর্তমানে সন্দেহভাজন কভিড-১৯ আক্রান্তের লালারস নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। রিয়েল টাইম পিসিআর টেস্ট করা হয়। পুল টেস্টের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই ধরনের টেস্ট করা হবে। পার্থক্য মাত্র এক জায়গায়। নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে। পুল টেস্টে একসঙ্গে দুই থেকে পাঁচজনের লালারসের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এরপর সংগৃহীত নমুনাগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। রিয়েল টেস্টের মতোই ল্যাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলাফল দেওয়া হবে। পরীক্ষায়মিশ্রিত নমুনা নেগেটিভ হলে বোঝা যাবে যে, লালারস সংগৃহীত ব্যক্তিদের কারও মধ্যে ভাইরাসের অস্তিত্ব নেই। আর পজিটিভ রেজাল্ট হলে ধরে নিতে হবে ওই পুলের মধ্যে কোনো একজন বা একাধিকজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। সে ক্ষেত্রে ওই পুলে যে কজনের নমুনা সংগ্রহ করে মেশানো হয়েছিল, তাদের প্রত্যেকের আলাদা করে পরীক্ষা করা হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ কম বা একেবারেই নেই, সেসব এলাকায় পুল টেস্ট করা যেতে পারে। পুল টেস্ট করা হবে শুধু উপসর্গহীন মানুষদের ক্ষেত্রে। ৫ শতাংশের বেশি যেখানে সংক্রমণের পরিমাণ, সেখানে পুল টেস্ট করা যাবে না। যারা কভিড পজিটিভ রোগীর প্রত্যক্ষ সং¯পর্শে এসেছেন তাদের জন্য রিয়েল টেস্ট বাঞ্ছনীয় বলে অভিমত প্রকাশ করেছে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা।

উপসর্গহীন রোগীদের সন্ধান করতে পুল টেস্ট দ্রুত এবং কার্যকর পদ্ধতি। উপসর্গহীন রোগী বিপদ বাড়াতে পারেন। উপসর্গহীন আক্রান্ত বাহক হিসেবে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন। পুল টেস্টে, একটি কিট ব্যবহার করে পাঁচজনের একসঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে খরচ কমছে। একটি কিটে একজনের পরীক্ষা হয়। পাঁচজনের পরীক্ষা হলে কিটের খরচ এবং সময় দুটোই সাশ্রয় হবে। মূলত সময় এবং খরচ বাঁচিয়ে টেস্টের সংখ্যা বাড়াতেই এ ধরনের ব্যবস্থা/প্রস্তাবনা। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নতমানের কিটের স্বল্পতা রয়েছে। আবার আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীও তুলনামূলক কম। তাই এক কিটেই একাধিক লোকের পরীক্ষা করার জন্য পুল টেস্টে খরচ কমবে। আবার কম জনবল দিয়েই অতি দ্রুত বেশির ভাগ লোককেই পরীক্ষার আওতায় আনা যাবে।

এসব প্রস্তাবনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভেবে দেখতে পারেন। এই পদ্ধতি আমাদের দেশীয় পরিবেশ বিবেচনা করে সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন সিদ্ধান্তও নেওয়া যেতে পারে। মৃত্যুহার কমাতে হলে টেস্টের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আমরা জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দিতে পারি। ইসরায়েল-হংকং-ভিয়েতনামের উদাহরণ দিতে পারি। জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ বেশি পরীক্ষা করা হয়েছে। সে হিসেবে সেখানে মৃত্যুর হার কম। টেস্টের পর যার যার জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র ইউরোপ হলেও করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সফল মনে করা হচ্ছে জার্মানিকে। দেশটির উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা ও ব্যাপক হারে পরীক্ষাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব বলছে, জার্মানির ৬০ শতাংশের বেশি করোনা রোগী এখন সুস্থ। ইউরোপ-আমেরিকার আর কোনো দেশে এত রোগী এখনো সুস্থ হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া আজ সফল। লকডাউন তুলে নিতে যাচ্ছে তারা।

লেখক : উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত