হাওরের বোরো ধান ও খাদ্য নিরাপত্তা

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২০, ১২:০৭ এএম

বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান থেকে। আর উৎপাদিত বোরো ধানের শতকরা ২০ ভাগ পাওয়া যায় হাওরাঞ্চল থেকে। যে বছর হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়, কৃষক নির্বিঘেœ ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সে বছর চালের দাম ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। নিশ্চিত হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কখনো কখনো হাওরের কৃষক কষ্টের ধান ঘরে তুলতে পারেন না। ২০১৭ সালে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের ১০ লাখ মেট্রিক টন পাকা ধান বন্যার পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যায়। হাওরে বোরো ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসলের চাষ হয় না বললেই চলে। বোরো ধানের ওপরই হাওরবাসীর একমাত্র ভরসা। বোরো ধান কাটার পর হাওরের কৃষিজমি তলিয়ে যায় বর্ষার পানিতে। সারা হাওরাঞ্চল থৈ থৈ করে পানিতে। এ সময় নৌকা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলে না। কিছু মানুষ এসময় হাঁস পালন ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু অধিকাংশ হাওরবাসীই জীবিকা নির্বাহ করেন বোরো ধানের উপার্জিত অর্থ দিয়ে।

এবার করোনা মহামারীর দুর্যোগের মধ্যে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় হাওরাঞ্চলের বোরো ধান কাটা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক শনিবার জানিয়েছেন, চলতি বোরো মৌসুমে হাওর এলাকায় ৪৪ শতাংশ ধান কাটা ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ,  মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি জেলায় এ বছর শুধু হাওরে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ১.৯৮ লাখ হেক্টর জমির ধান, যা শতকরা ৪৪ ভাগ। সিলেটে ৫৩, মৌলভীবাজারে ৫৪, হবিগঞ্জে ৩৭, সুনামগঞ্জে ৪৮, নেত্রকোনায় ৫৬ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

এবার হাওর এলাকায় ৩ লাখ ৯ হাজার ২৪৪ শ্রমিক, ৩৫৯টি কম্বাইন হার্ভেস্টার ও ৪৪২টি রিপার ধান কাটার কাজে নিয়োজিত আছে। কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নানান উদ্যোগের ফলে হাওরের কৃষকরা ভালোভাবে ধান কাটতে পারছেন। পরিবহন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ধান কাটার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকদের আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা এসেছেন। শ্রমিকের পাশাপাশি হাওর এলাকায় ধান কাটার জন্য কম্বাইন হার্ভেস্টার ও রিপার ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরোদমে ধান কাটা চলছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, হাওর অঞ্চলের সাত জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭২১ হেক্টর, উফশী ধানের চাষ হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৫ হেক্টরের। সবচেয়ে বেশি বোরো ধানের চাষ হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। জেলাটিতে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া নেত্রকোনা জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭ হেক্টর, কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে ১ লাখ ২০ হাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, সিলেটে ৮০ হাজার ৫০ ও মৌলভীবাজারে ৫৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।

আর সারা দেশে চলতি বোরো মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৫১৮ হেক্টর জমিতে। এ পরিমাণ জমি থেকে ২ কোটি টন চাল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চল থেকে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ মেট্রিক টন চাল। করোনাভাইরাসের কারণে বোরো ধান কাটার শ্রমিকের অভাব পূরণে হাওর অঞ্চলে ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যন্ত্রপাতি বরাদ্দ করাটা ছিল খুবই ইতিবাচক। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এ মাসের শুরুতেই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হাওর অঞ্চলের ধান কাটার জন্য জরুরিভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার সরবরাহের বরাদ্দ প্রদান করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বর্তমানে হাওর অঞ্চলে ৩৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১০৫৬টি রিপার সচল রয়েছে। এ ছাড়াও ২২০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ৪৮৭টি রিপার অতি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়,

কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেটের আওতায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে ১০০ কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যক্রম চলছে। আগামী জুনের মধ্যে ৬৪ জেলায় তিন ক্যাটাগরির কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার সরবরাহ করা হবে। এসব আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং ফসলের অপচয় রোধ হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে কৃষি অধিকতর লাভবান ও বাণিজ্যিকীকরণ ঘটবে।

একটি কম্বাইন হারভেস্টার প্রতি ঘণ্টায় এক একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করতে পারে। এতে খরচ হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্রমিকের দ্বারা এ কাজ করতে খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। শ্রমিকের দ্বারা প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান কাটা ও মাড়াই কাজে যেখানে ফসলের অপচয় হয় শতকরা ৫ ভাগ, সেখানে কৃষি যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের অপচয় হয় মাত্র শতকরা ২ ভাগ। এ ছাড়া কম্বাইন হারভেস্টারের দ্বারা ধান কাটার পর খড় আস্ত থাকে। বর্তমানে ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের প্রচুর অভাব দেখা দেয়। মজুরিও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এমতাবস্থায় কৃষিকে লাভজনক করার একমাত্র উপায় হলো যান্ত্রিকীকরণ। জানা যায়, কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ কমানো যায়। সময় বাঁচানো যায় ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ এবং শতকরা ৭৫ ভাগ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।

সম্প্রতি এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কারও এতটুকু জমি অনাবাদি না রেখে তাতে ফলমূল, শাকসবজি ও শস্য উৎপাদনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আশঙ্কা করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সেরকম অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকলে অন্যদের সাহায্য করতে পারবে।

চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৬ লাখ টন ধান ও সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এর মধ্যে মিলারদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং কৃষকের কাছ থেকে ৬ লাখ টন ধান কেনা হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতিকেজি ২৮ টাকা দরে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত গম সংগ্রহ চলবে। আগামী ২৬ এপ্রিল থেকে বোরো ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হবে। সংগ্রহ অভিযান শেষ হবে ৩১ আগস্ট।

বাংলাদেশ চাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও এখনো আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশ থেকে গম, ভুট্টা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন মসলা, গুঁড়াদুধ, হাঁসমুরগি, গবাদিপশু ও মাছের খাবার আমদানি করতে হয়। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এসব জিনিসের দাম বিশ্ব বাজারে কী অবস্থায় দাঁড়ায়- তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। ভবিষ্যতে বিশ্বে যে একটি খাদ্য সংকট আসন্ন সেটাকে ধরে নিয়েই আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। করোনার প্রভাব থেকে কৃষিকে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে শাকসবজির দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের মনোবল ভেঙে গেছে। কৃষকের কাছে এ সময়ে নগদ অর্থ নেই। অর্থের অভাবে কৃষকের বোরো ধান কাটা যাতে ব্যাহত হয়, সেজন্য বোরো ধান চাষিদের স্বল্প সুদে ও স্বল্প সময়ের জন্য কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সারা দেশে ‘কৃষক অ্যাপ’ এর মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বোরো ধান কেনার নিয়ম চালু করতে হবে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হবেন এবং ঘরে বসে ধানের মূল্য পাবেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড, নাটোর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত