মওকুফের সময় শেষে পুরো চার্জ আদায়ে অটল চবক

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ০৫:০৯ এএম

দেশে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় চট্টগ্রাম বন্দরও তীব্র কন্টেইনার জটে প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ (চবক) দ্রুত আমদানি পণ্যের কন্টেইনার খালাস করে নিতে বন্দরের ভাড়া ও পেনাল রেন্ট ২০ এপ্রিল পর্যন্ত শতভাগ মওকুফ করে। এ সময় আটকাপড়া হাজার হাজার কন্টেইনারের একটি অংশ খালাস করে নেওয়া হলেও বেশির ভাগ আমদানিকারক কাস্টম হাউজ বন্ধ থাকাসহ কার্যত লকডাউনজনিত নানাবিধ জটিলতায় এ সুযোগ নিতে পারেনি। ২১ এপ্রিল চবক ফের তাদের আগের অবস্থানে চলে যায় এবং যারা ওই সময়ের মধ্যে কন্টেইনার খালাস করে নেয়নি; তাদের পূর্ববর্তী সময়ের পুরো চার্জ পরিশোধ করে পণ্য খালাসের আদেশ দেয়। এ  ক্ষেত্রে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ভাড়া মওকুফের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মহল বন্দর কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বাউলিয়াপনা ও দ্বিমুখী নীতির পরিচায়ক হিসেবে অভিহিত করে বলছে, দেশে দেশে লকডাউনের কারণে আমদানি পণ্যের কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) যথাসময়ে হাতে আসেনি। ব্যাংক ও কাস্টম হাউজ বন্ধ ছিল। ফলে ২০ এপ্রিলের আগে অধিকাংশ আমদানিকারক কাস্টম হাউজে ডকুমেন্ট জমা দিতে পারেনি। তাই ওই সময় পণ্যের শুল্কায়ন কার্যক্রমও হয়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, কাস্টমস কর্র্তৃপক্ষ অ্যাসেসমেন্ট (পণ্যের শুল্ককর নির্ণয় কাজ) করতে পারেনি। তার দায় ব্যবসায়ীরা নিতে পারেন না।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্দরের চার্জ মওকুফের সময়সীমা বাড়ানোর ‘মধ্যবর্তী সুযোগ’ আছে কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ডাকার জন্য চবক চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সেই বৈঠক এখনো ডাকা হয়নি এবং বন্দর কর্তৃপক্ষও অনড় অবস্থানে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে চবক সচিব ওমর ফারুক জানান, সময় বাড়ানো কিংবা কর মওকুফের বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে নেই।

বন্দর সূত্রগুলো জানায়, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকার গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর বন্দর থেকে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বন্দরের সংরক্ষিত ইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ থেকে নামানো আমদানি পণ্যের কন্টেইনার ধারণক্ষমতা লোপ পায়। সাধারণ ছুটির কারণে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজেও পণ্য শুল্কায়ন কাজকর্ম বন্ধ থাকে। এ অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ বাড়তি কন্টেইনার জেটি ইয়ার্ডের বাইরে বেসরকারি ১৯টি অফডকে সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয় এবং বন্দরকে কন্টেইনার জটমুক্ত করতে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ইতিপূর্বে আরোপিত পেনাল রেন্ট (নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত জরিমানা) প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

জানা যায়, এ সময়ের মধ্যে বেশ কিছু আমদানিকারক বন্দরকে নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করে তাদের পণ্যবোঝাই কন্টেইনার খালাস করে নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু বেশির ভাগ আমদানিকারকেরই দেশে দেশে লকডাউনের কারণে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক দেশ থেকে তাদের আমদানি পণ্যের ডকুমেন্ট পেতে বিলম্ব হয়। তা ছাড়া ব্যাংক ও কাস্টম হাউজ বন্ধ থাকায় ডকুমেন্ট (আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রামাণ্য দলিল) হাতে পাওয়ার পরও তা অ্যাসেসমেন্টের জন্য কাস্টম হাউজে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত রবিবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরে ৪৮ হাজার টিইইউস বিভিন্ন পণ্যের কন্টেইনার জমা পড়ে আছে।

ভুক্তভোগী আমদানিকারকরা দেশ রূপান্তরকে তাদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে কাস্টম হাউজে কেবল বাণিজ্যিক পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট বা শুল্কায়ন শুরু হয়েছে। এর আগে কিছু শিল্প পণ্যের শুল্কায়ন হলেও বাণিজ্যিক পণ্যের শুল্কায়ন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। তারা বলেন, আমদানিকারকরা বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নিতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ ছুটিতে ব্যাংক এবং কাস্টম হাউজ বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। কাস্টমসে কাজ বন্ধ থাকায় তার ‘কাফফারা’ (মাশুল) দিতে হচ্ছে সাধারণ আমদানিকারকদের।

ভুক্তভোগী আমদানিকারকদের একজন গাজী ট্রেডার্সের মালিক নেওয়াজ আলী গাজী দেশ রূপান্তরকে জানান, নিউজপ্রিন্ট, প্লাস্টিক দানা, রেজিন ও অন্যান্য আইটেমের ২০০ টন পণ্যের একটি আমদানি চালান বন্দরে জমা পড়ে আছে। লকডাউনের কারণে এসব আমদানি পণ্যের ডকুমেন্টস কুরিয়ার সার্ভিসে বিলম্বে পৌঁছায় তিনি ২০ এপ্রিলের মধ্যে পণ্য খালাস করতে পারেননি। এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০ এপ্রিলের পূর্ববর্তী সময়ের অর্থাৎ যেদিন থেকে পণ্য জাহাজ থেকে আনলোডিং বা নামানো হয়েছে, সেদিন থেকে চার্জ ধরে পণ্য ডেলিভারি নিতে বলছে। এতে তার পাঁচ লাখ টাকা বাড়তি চার্জ বা ‘ডেমারেজ’ দিতে হবে। তিনি বলেন, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ভাড়া মওকুফ করা হয়েছিল। এ সময় করোনা বিপর্যয়ের কারণে লকডাউন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও কাস্টম হাউজ বন্ধ থাকায় যেসব আমদানিকারক বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নিতে পারেননি তাদের ওপর ২০ এপ্রিলের পর থেকে পেনাল্টিস্বরূপ বাড়তি চার্জ চবক নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু ২০ তারিখের আগেকার সম্পূর্ণ চার্জ আদায় যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এতে ব্যবসায়ীরা মাশুল গুনতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ লোকসানের সম্মুখীন হবেন। আর লাখ লাখ টাকা ডেমারেজ দেওয়ার কারণে তা বাজারে পণ্যমূল্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ প্রসঙ্গে আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণের কাজে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এস কে এস সিন্ডিকেট (প্রা.) লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইতিপূর্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের চিঠিতে ২৭ মার্চ থেকে যেসব পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়বে সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে বন্দরের ভাড়া শতভাগ (১০০ ভাগ) মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিল। যেটি ২০ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু ২১ এপ্রিল থেকে যারা পণ্য খালাস করতে আসছেন, তারা এই সিদ্ধান্তের আওতায় পণ্য খালাসের সুবিধা পাচ্ছেন না; বরং তাদের সম্পূর্ণ চার্জ পরিশোধ করেই পণ্য খালাস করে নিতে হচ্ছে। এতে ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা মহা ফাঁপড়ে পড়েছেন এবং তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। যদিও দায়টা পুরোপুরি আমদানিকারকদের নয়। তিনি লকডাউন পরিস্থিতিতে কাস্টম হাউজ বন্ধ থাকার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এ সময় বেশির ভাগ আমদানিকারক তাদের আমদানি পণ্যের ডকুমেন্ট অ্যাসেসমেন্টের জন্য কাস্টম হাউজে জমা দিতে পারেননি।

পেনাল রেন্ট নিয়ে বন্দরের অনড় অবস্থান এবং এ নিয়ে বিপাকে পড়া ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা গচ্চা যাওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের অবস্থান জানতে চাইলে চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এটা ব্যবসায়ীদের ত্রুটি নয়; কাস্টমস অ্যাসেসমেন্ট করেনি। এ জন্য ব্যবসায়ীরা ডেমারেজ দিতে পারেন না।

এ নিয়ে গত সপ্তায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষকে চেম্বারের পক্ষ থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয় জানিয়ে চেম্বার সভাপতি বলেন, চিঠিতে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বন্দরের ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফের জন্য আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এখনো সেই চিঠির জবাব মেলেনি। তবে তিনি অনতিবিলম্বে বিষয়টি নিয়ে চবক চেয়ারম্যান ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।

চবক সচিব ওমর ফারুক চট্টগ্রাম চেম্বারের চিঠি প্রাপ্তির কথা দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ বিনা মাশুলে ব্যবসায়ীদের পণ্য খালাসে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তারা ওই সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করে নেননি। তাই এখন সম্পূর্ণ চার্জ পরিশোধ করেই পণ্য খালাস করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আংশিক বা পুরো চার্জ মওকুফ করার এখতিয়ার চবকের নেই জানিয়ে বন্দর সচিব বলেন, পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের (চবক) কিছু করণীয় নেই।

বন্দরে আমদানি পণ্য খালাসে ভাড়া বা ডেমারেজ মওকুফের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত দেবে কি না জানতে চাইলে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ নিয়ে ২৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ চট্টগ্রামে গিয়ে আমরা বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে বলেছি, ব্যবসায়ীদের ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে এবং একটা মধ্যবর্তী সময় নির্ধারণ করা যায় কি না, তার সিদ্ধান্ত নিতে।’

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কোনো সভা ডাকেনি এবং কবে, কখন বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করবে, তারও কোনো আভাস মেলেনি। এ অবস্থায় আমদানিকারকরা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কেননা, যত দিন গড়াচ্ছে, বন্দরে আটকে থাকা পণ্যের ‘ডেমারেজও’ চক্রাকারে বাড়ছে।

উল্লেখ্য, চবক বিধি অনুসারে বন্দরে খালাস করা পণ্যের ওপর প্রথম তিন দিন চার্জ ধার্য হয় না। পরবর্তী সাত দিনে টনপ্রতি চার্জ ১২ ডলার, দ্বিতীয় সপ্তায় ২৪ ডলার এবং তৃতীয় সপ্তায় ৪৮ ডলার দিতে হয়। এভাবে যত দিন গড়াবে ততই দ্বিগুণ হারে চার্জ পরিশোধ করতে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত