অগ্রদূত প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরীর প্রয়াণ

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১৯ এএম

একুশে পদকপ্রাপ্ত খ্যাতিমান প্রকৌশলী জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্ত্রী সেলিনা চৌধুরী, মেয়ে কারিশমা ফারহিন চৌধুরী, ছেলে কাশিফ রেজা চৌধুরীসহ অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন। গতকাল বাদ জোহর রাজধানীর ধানমণ্ডি ঈদগাহ মসজিদে জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তার আত্মীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত-উল-ইসলাম জানান, সোমবার রাত ২টার পর ঘুমের মধ্যে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়। পরে ভোর ৪টার দিকে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা গেছেন।

১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন একাধারে গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। ২০১৮ সালে জামিলুর রেজা চৌধুরীকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তার মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দেশে গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা প্রায় সব বড় বড় ভৌত অবকাঠামো প্রকল্পে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক জামিলুর রেজা চৌধুরী। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের ইমারত বিধি তৈরি দলটিরও একজন সদস্য ছিলেন এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দেশের প্রথম মেগা প্রকল্প বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে ৫ সদস্যের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। পদ্মা সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্যানেলেও নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ চলমান নানা উন্নয়ন প্রকল্পেও তিনি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।

১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেট শহরে প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী ও হায়াতুন নেছা চৌধুরীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাবার বদলির চাকরির কারণে তার শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। প্রাথমিক শেষ করে ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে ভর্তি হলেও পরে তার পরিবার ঢাকায় চলে আসে। প্রথমে নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পরে সেইন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন।

ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে জামিলুর রেজা চৌধুরী ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তখনকার আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ)। ১৯৬৩ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। ১৯৬৮ সালে সেখানেই পিএইচডি শেষ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘শিয়ার ওয়াল অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস অব হাইরাইজ বিল্ডিং’। এরপর দেশে ফিরে আবারও বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। পদোন্নতির ধারায় ১৯৭৬ সালে হন অধ্যাপক। ২০০১ সাল পর্যন্ত বুয়েটে অধ্যাপনা করার সময় বিভিন্ন সময়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও ফ্যাকাল্টির ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২-৯২ সাল পর্যন্ত বুয়েটের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন তিনি। পরে ওই কম্পিউটার সেন্টারই বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজিতে পরিণত হয়।

বুয়েট থেকে অবসরে যাওয়ার পর ২০০১ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। সেই দায়িত্বে তিনি ছিলেন ২০১০ সাল পর্যন্ত। এরপর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন।

বিশেষজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন পরামর্শক প্যানেলে জামিলুর রেজা চৌধুরীর ডাক পড়েছে। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সফটওয়্যার রপ্তানি এবং আইটি অবকাঠামো টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ সাল থেকে পাঁচ বছর। ১৯৯৯ সালে জামিলুর রেজা চৌধুরীকে তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক করে সরকার।

২০০১ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর আইটি টাস্কফোর্সেরও সদস্য করা হয়। পুরকৌশলের এই শিক্ষক নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান জামিলুর রেজা চৌধুরী। যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের ফেলো জামিলুর রেজা চৌধুরী নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটিতেও তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়ার্ড কমিটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেছেন।

বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডসহ নানা আয়োজনে জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়। বহুতল ভবন নির্মাণ, স্বল্প খরচে আবাসন, ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নকশা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে ইমারত রক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশল নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৭০টি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে তার।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে অবদানের জন্য ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন তিনি। ২০১৮ সালের জুনে আরও দুজন শিক্ষকের সঙ্গে তাকেও জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করা হয়। একই বছর জাপান সরকার জামিলুর রেজা চৌধুরীকে সম্মানজনক ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান, গোল্ড রেইস উইথ নেক রিবন’ খেতাবে ভূষিত করে। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।

শোক : দেশের গুণী এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান।

এছাড়া তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীমসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শোকের ছায়া নেমে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে ফেইসবুকেও গুণী এই ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করে শোকপ্রকাশ করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত