নবীন আইনজীবীদের করুণ দশা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২০, ০৫:৪০ এএম

অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন (ছদ্মনাম)। ২০১৮ সালে আইনজীবী হিসেবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত হন। নতুন স্বপ্ন নিয়ে আইনপেশা শুরু করেন ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতে। স্ত্রীকে নিয়ে ওঠেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায়। নবীন আইনজীবী (জুনিয়র) হিসেবে দৈনিক মামলার ভিত্তিতে তার আয়-রোজগার। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ। রোজগার নেই। দু’মাসের বাসাভাড়া বাকি পড়েছে। আর্থিক সংকটে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে স্ত্রীকে নিয়ে ময়মনসিংহে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন তিনি। একজন পেশাজীবী হয়েও তাকে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর। শিহাব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়িওয়ালার সামনে যাতে পড়তে না হয়, সেজন্য এক প্রকার লুকিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছি। শ্রমজীবীরা চেয়ে-চিন্তে কিছুটা হলেও খেতে পারছেন। তাদের জন্য অনেকেই এগিয়ে আসছেন। সরকারের সাহায্য আছে। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ নেই। পেশাগত মর্যাদা ও আত্মসম্মানের কারণে যন্ত্রণার কথা কাউকে বলতেও পারি না। ঋণের জন্য ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে আবেদন করেছি। এটি পেলে বাসাভাড়া, দেনা ও অন্যান্য খরচ পরিশোধ হবে। সামনের দিনগুলোতে কী হবে, কে জানে!’

এ পরিস্থিতি শুধু শিহাবেরই নয়। করোনার কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের আদালতগুলোতে থাকা হাজার হাজার আইনজীবীর জীবনচিত্র পাল্টে গেছে। আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীও বিপাকে পড়েছেন। নবীন আইনজীবীরা (এক থেকে কয়েক বছর ধরে এ পেশায় যারা আছেন) আর্থিক সংকট ও দুর্দশায় পড়েছেন বেশি। কর্মহীন এই সময়ে বাসায় শুয়ে-বসে দিন কাটছে অনেকের। খরচের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে কেউ কেউ চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। নবীন একাধিক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমন দুর্দিন জীবনে আসবে তা তাদের কল্পনাতেও আসেনি। সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধের কারণে অনেকেই নীরব যন্ত্রণা সইছেন।

ইতিমধ্যে আইনজীবীদের বর্তমান দুর্দশা লাঘবে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও ঢাকা আইনজীবী   সমিতি। জানা গেছে, শুধু ঢাকা বারেই এজন্য আবেদন করেছেন সাড়ে ৭ হাজার আইনজীবী। আর সুপ্রিম কোর্ট বারের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ আইনজীবী সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করেছেন। উভয় বারে আবেদনকারী আইনজীবীদের বড় অংশই নবীন। উচ্চ আদালতে আইনি পেশায় রয়েছেন সাত হাজারেরও বেশি আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত নবীন আইনজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমন দুর্দিন অনেকে কল্পনাও করতে পারেননি। আইনজীবীদের কল্যাণকামী সংগঠন হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এজন্য আমরা তাদের সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে সরকার এবং বার কাউন্সিলকে আইনজীবীদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এখানে বার কাউন্সিল সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা সরকার ও বার কাউন্সিলকে অবহিত করেছি।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে বলা হয় এশিয়ার বৃহত্তম বার। এখানে আইনি পেশায় রয়েছেন ২৫ হাজারেরও বেশি আইনজীবী। তবে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের পদচারণায় মুখর সেই আদালতপাড়া এখন জনশূন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বারের এক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা কেবল ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারছেন। সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার কারণে আইনজীবীরা কারও কাছে কিছু চাইতে পারছেন না। অসংখ্য আইনজীবী সংসার চালাতে পারছেন না। বাসাভাড়া বাকি পড়েছে অনেকের। এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে কে জানে!’ একই আদালতের আরেক আইনজীবী বলেন, ‘স্বপ্ন নিয়ে আইনপেশায় এসেছি। কিন্তু করোনার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অনেক বড় ধাক্কা খেতে হলো। আমার মতো নবীন আইনজীবীরা বেশি দুর্দশায় পড়েছেন। বিশেষ প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছিলাম অনেক দিন আগে। ব্যাংকের চাপে স্ত্রীর একটি ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে সেই লোন পরিশোধ করতে হয়েছে। এই দুর্দিনে এখন হাত একেবারেই খালি। খরচের ভয়ে বাজারে যাই না। কোনো মতে দিন কাটাতে হচ্ছে।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির নেতারা জানান, অন্তত ১৫-২০ হাজার আইনজীবী এই বারে সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে একটা বড় অংশ বিশেষ করে নবীন আইনজীবীদের দৈনিক মামলার ভিত্তিতে রোজগার হয়। করোনার এই দুর্দিনে ইতিমধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জন আইনজীবী সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করেছেন। সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন আইনজীবী বাসায় শুয়ে-বসে কত দিন সময় কাটাতে পারেন? অনেক ফোনে তাদের দুর্দশার কথা বলেন। আইনজীবীদের অনেকের বিশেষ করে নবীনদের দৈনিক মামলার ভিত্তিতে রোজগার হয়। এ কারণে তাদের সমস্যা একটু বেশি হচ্ছে। সাড়ে ৭ হাজারের বেশি আইনজীবী ঋণের আবেদন করেছেন। এতেই বোঝা যায় তাদের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঋণের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কে কত বছর ধরে প্র্যাকটিস করছেন তা দেখা হচ্ছে। মুশকিল হলো সুদমুক্ত ঋণ দিতে হলে আমাদের সমিতির রুলস পরিবর্তন করতে হবে। দ্রুত সমাধানের জন্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সমিতির সাবেক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আর আইনজীবীদের দুর্দশা লাঘবে সরকার ও বার কাউন্সিলে আবেদন করলেও এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত